দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরকারি সেবার মান হ্রাস এবং তীব্র আবাসনসংকটের জেরে ইউরোপের একাধিক দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশটির উত্তরাঞ্চলের লিলসহ চারটি শহরে গতকাল সোমবার রাত আটটা থেকে আজ মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এবং আজ রাত আটটা থেকে আগামী বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত আংশিক কারফিউ জারি করেছে সরকার।
গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। দিনের শুরুতে অনেক জায়গায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরবর্তীতে তা চরম সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায়। রাস্তার পর রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ভাঙা কাচ এবং ধিকিধিকি জ্বলছিল আগুনের ধোঁয়া।
শনিবারের এই গণবিক্ষোভের পর থেকে ফ্রান্সে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। এমনকি পুলিশের ব্যবহৃত একটি ভিড় নিয়ন্ত্রণকারী গ্রেনেডের আঘাতে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
সহিংসতায় তিন হাজারেরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাণিজ্য সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুধু রাজধানী প্যারিসেই তিন শ থেকে চার শ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে, যার মধ্যে শহরের অভিজাত দোকানগুলোর দরজা ও জানালার কাচ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালির মিলানেও শনিবার ও রোববার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। অন্যদিকে স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়ার অত্যধিক চাপ ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ সহিংস রূপ নিয়েছে। দেশভেদে দাবির ভিন্নতা থাকলেও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভই এই সব আন্দোলনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর কার্যালয়ের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের চার শহরে দুই রাতের জন্য আংশিক কারফিউ কার্যকর থাকবে, যার মধ্যে লিল অন্যতম। বিধিনিষেধের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে স্থানীয় সময় রাত আটটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত। তবে রাজধানী প্যারিসজুড়ে একসঙ্গে কারফিউ জারির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন লেকর্নু।
গতকাল মন্ত্রীদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমি পুরোপুরি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন হলে জরুরি অবস্থা জারি করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
এদিকে মার্সেই শহরে গতকাল দুপুর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। তবে এটি সাধারণ কারফিউ নয়, বরং সমাবেশের ওপর আরোপিত একটি আলাদা নিষেধাজ্ঞা। উত্তরাঞ্চলের দেনাঁ শহরেও প্রথমে কারফিউ ঘোষণা করা হয়েছিল, যা পরে নির্দিষ্ট এলাকায় কেবল অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সীমিত করা হয়।
ফ্রান্সে এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয় সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে, যখন শিক্ষকসংকট ও স্কুলের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামে। পরবর্তীতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনে যোগ দেন। চলতি বছরের মার্চের পর দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
শনিবারের সহিংসতা দমনে প্রায় ৬০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হলেও প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁর মেয়ররা নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন। ফরাসি দৈনিক লিবারাসিওঁতে গতকাল প্রকাশিত এক যৌথ লেখায় তাঁরা বলেন, ‘শনিবার প্রথমবারের মতো আমাদের মনে হয়েছে, আমাদের শহরগুলোর বিস্তীর্ণ অংশ কোনো সুরক্ষা ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছে।’
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগ করতে চাইলেও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি। গত রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নিজ দেশে চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে গতকাল সোমবার থেকে তিন দিনের উপসাগরীয় সফর শুরু করেন প্রেসিডেন্ট মাখোঁ। কুয়েত সফরের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
ফ্রান্সের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আন ল্য হেনানফ অভিযোগ করেছেন যে, সপ্তাহান্তে লুট হওয়া পণ্য অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। তিনি দ্রুত এসব বিজ্ঞাপন সরানোর আহ্বান জানান। এই বিষয়ে ভিনটেড, অ্যামাজন, ইবে, লেবনকোয়াঁ, মেটা ও টিকটকের প্রতিনিধিদের আলোচনায় ডাকা হয়।
ভিনটেড জানিয়েছে, তারা সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন সরাতে কাজ করছে। তবে ইবে নিশ্চিত করতে পারেনি যে লুটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন বেড়েছে কি না। মন্ত্রী বলেন, চোরাই পণ্য বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে।
গতকাল বিক্ষোভকারীরা প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে রাখে। দীর্ঘ উড়োজাহাজযাত্রা শেষে এসে জাদুঘর বন্ধ পেয়ে হতাশ হন অস্ট্রেলীয় পর্যটক অ্যান বোল্যান্ড। অন্য পর্যটকদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, ‘বাড়িতেই থাকুন!’
নেদারল্যান্ডসের পর্যটক পিটার জানান, শহরের রাস্তায় পোড়া আবর্জনা ও ভাঙা কাচ দেখে তাঁর মনে হয়েছে তিনি যেন ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ ঘুরছেন। গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিশেষ সতর্কবার্তা দিচ্ছেন ট্যাক্সিচালকেরা। আগামী শনিবার আবারও বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ‘ইয়েলো ভেস্টস’ আন্দোলন। এছাড়া শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।
ইতালির মিলান, বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া, বেরগামো ও তুরিনেও শনিবার বিক্ষোভ হয়। রোববার মিলানে মুখোশধারীরা রাস্তায় আগুন ধরিয়ে দোকানে লুটপাট চালায়, যা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। রয়টার্সের তথ্যমতে, রোববার মিলানে ২৭১ জনকে থানায় নেওয়া হয়, যাদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও ২৮ জনের বিষয়ে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এর আগে শনিবার উত্তরাঞ্চলের শহরগুলোতে গ্রেপ্তার করা হয় ২৮ জনকে।
প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে গতকাল সরকারি বৈঠক ডাকেন। তিনি বলেন, বিক্ষোভ করার অধিকার আছে, কিন্তু শহরে আগুন লাগানোর অধিকার নেই।
পর্তুগালে শনিবার রাজধানী লিসবনের রসিও চত্বরে শত শত মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নেন। পোর্তো শহরেও একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়। সমাজকর্মী এলেনা কস্তা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে বাসস্থানের অধিকার। আমরা যেন দমবন্ধ অবস্থায় আছি।’
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ। প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো মানুষের ক্ষোভের কথা বুঝতে পারার কথা জানালেও অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন।
স্পেনে সেপ্টেম্বরে ৮৭ বছর বয়সী মারিয়া দেল কারমেন আবাসকালকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ ঘিরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। নতুন মালিক ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়াতে চেয়েছিলেন, যার ফলে ওই নারীর মৃত্যু হয়। বর্তমানে মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান চলছে। ভাড়াটেদের সুরক্ষার উদ্যোগ পার্লামেন্টে আটকে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন।
বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজে শিক্ষার ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়। ব্রাসেলসে সংঘর্ষের সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, উচ্চ টিউশন ফি ও সরকারবিরোধী ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ চলছে। শনিবার রাজধানী তিরানায় বিক্ষোভকারীরা পাথর ও পেট্রলবোমা ছোড়েন, গাড়ি ও ময়লার পাত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। পুলিশ রাবার বুলেট ছোড়ে। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন।
এদিকে ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহিংসতার নিন্দা জানালেও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে।