বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকেল পাঁচটার পর হোটেল ইম্পেরিয়ালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকোর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান। উক্ত বৈঠকে জাইকার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট হারা শোহেই এবং সংস্থাটির অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ–প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এই বিষয়ে বিস্তারিত জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, সাক্ষাতের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাইকা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় অনুষ্ঠিত ফলপ্রসূ বৈঠকের কথা স্মরণ করেন। সেই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে জাপানের দীর্ঘমেয়াদী সহযোগিতা এবং জাইকার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, আর্থসামাজিক অগ্রগতি এবং সামগ্রিক উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা পূরণে জাপানের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর করে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রাখা জরুরি।”
বৈঠকে জাপানের সহায়তায় বর্তমানে চলমান বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি যেসব অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, সেগুলোর দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান উন্নয়ন অগ্রাধিকারগুলো বিবেচনায় নিয়ে জাপানের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহায়তা অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বারোপ করেন।
সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘বাংলাদেশ-জাপান দক্ষতা উন্নয়ন অংশীদারত্ব’ (বাংলাদেশ-জাপান স্কিলস পার্টনারশিপ) গড়ে তোলা, একটি ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নগরী’ (টেকনোলজিক্যাল ভিলেজ অ্যান্ড ইনোভেশন সিটি) প্রতিষ্ঠা এবং কৃষি আধুনিকীকরণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে জাপানি সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।
এছাড়া বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে গত বছরের মতো দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাজেট সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। জবাবে জাইকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের সমৃদ্ধি অর্জনে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশ ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং দুই দেশের অভিন্ন সমৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী মো. শাকিরুল ইসলাম খান, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দীকী, প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ বাংলাদেশ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গতকাল নিপ্পন ফাউন্ডেশন ও সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের অনারারি চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়ার আমন্ত্রণে এক নৈশভোজে অংশ নেন। জাপানের রাজধানী টোকিওতে অবস্থিত মেইজি কিনেনকানের হানাগাসুমি রেস্তোরাঁয় এই নৈশভোজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
গত সেপ্টেম্বরে ঢাকায় ইয়োহেই সাসাকাওয়ার সঙ্গে বৈঠকের কথা স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে মানবিক সহায়তা, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য খাতে সাসাকাওয়ার দীর্ঘদিনের অবদানের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে টিকা উৎপাদন কারখানা স্থাপনে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়।
নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, নিপ্পন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক তাকাশি আরিকাওয়া ও সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেছেন, “জাপানের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি এবং পারস্পরিক স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ রয়েছে। জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
গতকাল টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রথম দিনের কর্মসূচি তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জাপান সফরও দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বর্তমান সফর সেই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।”
বাংলাদেশ ও জাপান দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও সানায়ে তাকাইচি। আজ মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বেলা ১১টায় টোকিওতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেইয়ে’ তাঁরা বৈঠক করবেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন বলেন, “আজ জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতে জাপানের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হবে।”
উপ–প্রেস সচিব আরও জানান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানাবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক হবে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। জাপানের স্থানীয় সময় গতকাল বিকেল পৌনে চারটায় টোকিওর ইম্পেরিয়াল হোটেলে জাপান বাংলাদেশ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি ও মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ গুরুত্বারোপ করেন।
সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে মাসুমি কাকিনোকির নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান।
এ সময় মাসুমি কাকিনোকি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ সৃষ্টির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং উন্নত উৎপাদনশিল্পসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান।