যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে চলমান সংঘাতের পাশাপাশি ইরানে এখন রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক তীব্র লড়াই চলছে। এই ক্ষমতার লড়াইয়ের এক প্রান্তে অবস্থান করছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো উদারপন্থী ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। অন্যদিকে, তাদের প্রবল প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে ‘পায়দারি ফ্রন্টের’ কট্টরপন্থীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের আলোচনা শুরুর বিষয়ে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কঠোর বিরোধিতা করছেন দেশটির আলোচনাবিরোধী কট্টরপন্থী গোষ্ঠীটি। এমন এক সময়ে এই উত্তেজনা বাড়ছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। এরই মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে ইরানকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে এই কট্টরপন্থীরা।

‘ফ্রন্ট অব ইসলামিক রেভল্যুশনারি স্ট্যাবিলিটি’ নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীটি ‘পায়দারি ফ্রন্ট’ হিসেবেও জনপ্রিয়। তারা দেশটির পার্লামেন্ট এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল) কাছে অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জোরালো আবেদন জানিয়েছে। বিশ্লেষকরা এই পদক্ষেপকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি পরোক্ষ আহ্বান হিসেবে দেখছেন। পায়দারি ফ্রন্টের দাবি, এই ধরনের সামরিক উদ্যোগগুলো নিতে হবে ‘যত দ্রুত সম্ভব’।

ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ইরানের কট্টরপন্থীদের এই অনমনীয় অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট। তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে—এই অজুহাতে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এই যুদ্ধের প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলায় ইরান এবং বিভিন্ন আরব দেশের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।

গত আট মাস ধরে যুদ্ধের পাশাপাশি ইরানে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই চলছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বাধীন উদারপন্থী ও মধ্যপন্থী শিবির সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে। কিন্তু পায়দারি ফ্রন্টের কট্টরপন্থীরা যেকোনো ধরনের আলোচনা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কট্টরপন্থীদের স্লোগানের মধ্যে রয়েছে, ‘আপস নয়, আত্মসমর্পণ নয়—আমেরিকার বিরুদ্ধে লড়াই চাই’ এবং ‘শত্রুর সঙ্গে আলোচনা মাতৃভূমির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের অধিবেশন শেষ করে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যখন তেহরানে ফিরে আসেন, তখন এই গোষ্ঠীটি ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

উদারপন্থী শিবিরের লক্ষ্য হলো দ্রুত সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে ইরানের ভেঙে পড়া অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা। অন্যদিকে, কট্টরপন্থীদের বিশ্বাস, ওয়াশিংটন কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে। তাই ইরানের দাবিগুলো মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নতি স্বীকার না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তারা।

ইরানের বড় শহরগুলোর রাজপথে এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চিত্র ফুটে ওঠে। প্রায় ২০০ দিন ধরে সেখানে রাতে সমাবেশ করছেন কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর সমর্থকেরা। শুরুতে এই জমায়েতগুলো ছিল সরকারের প্রতি সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের প্রতিবাদ জানানোর মাধ্যম। তবে সময়ের সাথে সাথে এগুলো সুসংগঠিত রাজনৈতিক সমাবেশে রূপ নিয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক পথে যুদ্ধ শেষ করার উদারপন্থী প্রচেষ্টাকে তীব্রভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

কট্টরপন্থীদের দাবি, যাঁরা আলোচনার মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আশা করছেন, তাঁরা বাস্তব বিশ্বকে বোঝেননি। তাঁদের মতে, বিশ্ব কেবল শক্তির ভাষাই বোঝে।

উল্লেখ্য, গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের নিন্দা জানান এবং একই সাথে কূটনীতির সুফল তুলে ধরেন। তবে তেহরানে ফেরার পর কট্টরপন্থীদের বিক্ষোভ ছিল প্রেসিডেন্টের কাছে তাদের ‘আলোচনাবিরোধী’ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি কৌশল।

রাজনৈতিক সমাবেশের বাইরেও এই গোষ্ঠীর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। তেহরানের নগর প্রশাসন, পার্লামেন্ট, ধর্মীয় বক্তা এবং শোকগাথা পাঠকারীদের মধ্যে তাঁদের শক্ত অবস্থান বিদ্যমান। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমেও তাঁদের প্রভাব লক্ষণীয়।

পায়দারি ফ্রন্টের ঘনিষ্ঠ পার্লামেন্ট সদস্য আমির হোসেন সাবেতি এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন যে, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরগুলোর ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা শুরু হবে না।

আমির হোসেন বলেন, ‘ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে শত্রু সরে আসেনি। তারা আবার অতর্কিত হামলা চালানোর উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় আছে। যাঁরা ভেবেছিলেন আলোচনা করে যুদ্ধ ঠেকানো যাবে, কিংবা আলোচনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে, তাঁরা বিশ্ব কীভাবে চলে, তা বোঝেননি। তাঁরা নিজেদেরই ভুল বুঝিয়েছেন। বিশ্ব শুধু একটি ভাষাই বোঝে। তা হলো শক্তির ভাষা।’

আমির হোসেনের রাজনৈতিক গোষ্ঠীটি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিকে অভিশংসন করার প্রস্তাব পার্লামেন্টে জমা দিয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে তাঁর নিউইয়র্ক সফরের পর এই প্রস্তাব আনা হয়। পাশাপাশি, বিদেশি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়াকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ হিসেবে গণ্য করার জন্য একটি আইন বিবেচনা করছে ইরানের পার্লামেন্ট, যা কার্যকর হলে কট্টরপন্থীদের জন্য বড় জয় হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন প্রক্রিয়া পার্লামেন্টে এগোলেও সরকারপন্থী রাজনৈতিক শিবির এখনো কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক দাভুদ হেশমতি মনে করেন, মার্কিন বাহিনী সম্ভবত সরকার উৎখাতের বড় লক্ষ্য থেকে সরে এসে ছোট কিছু লক্ষ্য বেছে নিয়েছে, যা কূটনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

কট্টরপন্থীদের ধারণা, কয়েক দফা লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই সংঘাত থেকে সরে যাবে। তবে হেশমতি এই যুক্তির সাথে একমত নন। তিনি বলেন, ‘যাঁরা বলছেন হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া যাবে না, তাঁরা মনে করেন যুদ্ধ শেষ হওয়া উচিত নয়। ইরানের আলোচনাবিরোধী শিবিরের দৃষ্টিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধের কোনো শেষ নেই। তবে এই যুদ্ধ থেকে তাঁরা কী ফল আশা করেন, তা ব্যাখ্যা করেন না। তাঁদের ধারণা, কয়েক দফা লড়াইয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র এমনিতেই সংঘাত থেকে সরে যাবে। কিন্তু আমরা যা দেখছি, সেই যুক্তির সঙ্গে এই ধারণা সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয় না।’

আল–জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেশমতি আরও বলেন, ‘অন্য ওই লক্ষ্যগুলো অর্জনের বেশ কয়েকটি উপায় আছে। যুদ্ধ তার একটি। তবে যুদ্ধ ঠেকাতে হলে আগে সামরিক পদক্ষেপের সব বিকল্প যাচাই করতে হবে। আলোচনা ও কূটনৈতিক চুক্তি এসব বিকল্পের মধ্যে পড়ে। যুদ্ধের চেয়ে সব সময় এগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।’

তিনি ইঙ্গিত দেন যে, যুদ্ধের সমাপ্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এমন সমঝোতা প্রয়োজন যেখানে ইরানের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সম্মান থাকবে। তাঁর মতে, শক্তির ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সব সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না, যদিও কূটনৈতিক পথে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস এখন বাস্তব।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভির মতে, কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো সুসংগঠিত এবং ইরানের ক্ষমতাকেন্দ্রের গভীরে তাঁদের অবস্থান রয়েছে। তাঁরা রাজনৈতিক আলোচনার গতিপথ পরিবর্তন এবং সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম, যা কূটনৈতিক উদ্যোগকে কঠিন করে তোলে।

তবে মোর্তাজাভি মনে করেন, রাজনৈতিক প্রভাব আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এক নয়। যুদ্ধ বা শান্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি এবং সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে। তিনি বলেন, কট্টরপন্থীরা আলোচনাপ্রার্থীদের হুমকি দিতে পারেন বা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন, কিন্তু সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সমর্থন থাকলে কোনো চুক্তি ঠেকাতে পারবেন না তাঁরা।

পুরো যুদ্ধের সময় তেহরান কূটনীতির পথ খোলা রেখেছে এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। কট্টরপন্থীরা তা রুখতে পারেননি। আল–জাজিরাকে মোর্তাজাভি বলেন, কূটনীতিকে জটিল করার ক্ষমতা তাঁদের থাকলেও তা পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। তাঁদের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার উদাহরণ হিসেবে বারাক ওবামার সময়ের জেসিপিওএ বা পারমাণবিক চুক্তি এবং ট্রাম্পের সাথে সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করেন তিনি, যা কট্টরপন্থীরা ঠেকাতে পারেননি।

রাজপথে সমাবেশ এবং টেলিভিশনে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কট্টরপন্থীরা শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিরোধিতা করলেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিশংসন শুনানির দিন নির্ধারণে বিলম্ব হচ্ছে। পাশাপাশি মধ্যস্থতাকারীদের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে উদারপন্থীরা এখনো ইরানের রাজনীতিতে এক প্রভাবশালী শক্তি।