এই সপ্তাহে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ ইরান সফর করেছেন। সেখানে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং প্রশাসনের উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন। উল্লেখ্য যে, ৮ অক্টোবর এবং ১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে অনুষ্ঠিত দুটি বৈঠকের পরপরই লাভরভের এই সফরটি সম্পন্ন হলো।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পারমাণবিক চুক্তি সংক্রান্ত সম্ভাব্য আলোচনায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে মস্কো। এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত সফল হবে কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত করে বলা তাড়াহুড়া হবে। তবে এমন কিছু যৌক্তিক কারণ রয়েছে, যা রাশিয়াকে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও কার্যকর মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।
একটি বৃহৎ পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি জায়ান্ট ‘রোসাটম’ বিশ্বের বেসামরিক পারমাণবিক শক্তি খাতের শীর্ষস্থানে থাকায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে রাশিয়ার পূর্ণ পারদর্শিতা ও গভীর জ্ঞান রয়েছে। এই কর্মসূচির প্রতি মস্কোর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি সব সময়ই অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা ইরানের অভ্যন্তরীণ পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনের আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করে; যার প্রমাণ হিসেবে বর্তমানে বুশেহরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি নতুন ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়া।
তবে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের বিষয়ে রাশিয়া কঠোরভাবে বিরোধী। কারণ, নিজেদের সীমান্তের এত কাছাকাছি পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রাশিয়া কোনোভাবেই কাম্য মনে করে না।
তা ছাড়া, ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের যে দ্বিধা–দ্বন্দ্ব ছিল, তা সম্প্রতি কেটে গিয়ে লক্ষণীয় উন্নতি হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ট্রাস্ট বা বিশ্বাসের অন্যতম প্রধান কারণ হলো—উভয় দেশই যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের শিকার হয়েছে। ইরানের ক্ষেত্রে এই আক্রমণ ছিল প্রত্যক্ষ, আর রাশিয়ার ক্ষেত্রে তা পরোক্ষ বা প্রক্সি যুদ্ধের রূপ নিয়েছে।
এখানে এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ইউরেশিয়ার সংকটগুলো—ইউক্রেন থেকে শুরু করে ইরান ও তাইওয়ান—পরস্পর গভীরভাবে যুক্ত, কারণ এতে আজকের বিশ্বের প্রধান ভূরাজনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তিগুলো জড়িত: যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া।
২০২২ সালে ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে ‘রাশিয়াকে কৌশলগতভাবে পরাজিত করার’ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এরপর ইরান রাশিয়ার সাহায্যে এগিয়ে আসে এবং রাশিয়ার কাছে তাদের শাহেদ ড্রোন প্রযুক্তি হস্তান্তর করে। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে, দুই দেশ একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির রূপরেখা তৈরি করে। তবে এখানে একটি বিষয় খেয়াল করা গুরুত্বপূর্ণ, রাশিয়ানরা চুক্তিতে একটি পারস্পরিক সামরিক সহায়তার ধারা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছিল, কিন্তু ইরানিরা তাতে সম্মতি দেয়নি।
অতএব, মস্কো নাকি ২০২৫ সালের ১২ দিনের যুদ্ধে এবং চলমান সামরিক সংঘাতের সময় তেহরানকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে—এমন সমালোচনা ভিত্তিহীন। রাশিয়া ইরানের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের ঋণ পরিশোধ করেছে।
ইরানের সঙ্গে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করা স্পষ্টতই রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করবে। যদিও মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণের মুখে ইরানের অভাবনীয় সহনশীলতার কারণে রাশিয়া ইরানকে প্রকৃত বিজয়ী হিসেবে দেখে, তবু তারা তাদের এই মিত্রের ওপর নেমে আসা ক্ষয়ক্ষতির বিশালতা উপলব্ধি করতে পারছে। রাশিয়া আশা করে যে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের প্রধান লজিস্টিক প্রকল্প ‘আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডর’ সক্রিয় হবে, যা ইরানের মধ্য দিয়ে ভারতে পৌঁছায়।
মৌলিকভাবে মস্কো আরব উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারি মিত্র হিসেবে দেখে এবং ইরানের পাল্টা ধাওয়া বা প্রতিশোধমূলক হামলার কারণে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধির দরুন রাশিয়া সাময়িক ও আর্থিকভাবে লাভবান হলেও এই সুবিধা দীর্ঘস্থায়ী নয়। তাই অবরুদ্ধ অবস্থা জারি থাকা তাদের স্বার্থের অনুকূল নয়।
ইরানের সঙ্গে মধ্যস্থতা করার ক্ষেত্রে মস্কো বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, কারণ তারা ২০১৫ সালের যৌথ ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরকারী আটপক্ষীয় আলোচনার অংশ ছিল, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কাজ করেছিল। সেই আটটি পক্ষের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়, অন্যদিকে ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয় পক্ষেই আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
ফলস্বরূপ এটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে মূল বিকল্প হিসেবে কেবল রাশিয়া ও চীনকে রেখে যায়। অন্যদিকে রাশিয়াও ইতিমধ্যে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। চলতি মাসে পুতিন টেলিফোনে ট্রাম্পের কাছে ইরানের একটি প্রস্তাব পৌঁছে দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পাশাপাশি, ইউক্রেন যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য মার্কিন কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ট্রাম্প প্রথমবারের মতো কিয়েভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেছেন যে আগামী মাসে শেনঝেনে এশিয়া-প্যাসিফিক ইকোনমিক কো–অপারেশন (অ্যাপেক) শীর্ষ সম্মেলনের সময় পুতিন ও চীনের নেতা সি চিন পিংয়ের সঙ্গে একটি নজিরবিহীন ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অর্থবহ হতে পারে, যদি তা পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ওপর আলোকপাত করে।
এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে ইউরেশিয়ার সংকটগুলো—ইউক্রেন থেকে শুরু করে ইরান ও তাইওয়ান—পরস্পর গভীরভাবে যুক্ত, কারণ এতে আজকের বিশ্বের প্রধান ভূরাজনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তিগুলো জড়িত: যুক্তরাষ্ট্র, চীন এবং রাশিয়া।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই তিন দেশের নেতারা একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছেন—এটি কেবল সংবাদ বিশ্লেষকদের আলোচনার বিষয় নয়, এর তাৎপর্য আরও গভীর। এটি হয়তো এক নতুন বিশ্বব্যবস্থার সূচনা নয়, তবে যুদ্ধের বিপরীতে কূটনীতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি ছোট পদক্ষেপ হতে পারে।
দিমিত্রি ত্রেনিন মস্কোর হাইয়ার স্কুল অব ইকোনমিকসের অধ্যাপক। আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।