সুনামগঞ্জে নারী বাউল শিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাতে ঢাকার ধানমন্ডিতে এক মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন একদল সংস্কৃতিকর্মী। আজ সোমবার বিকেল চারটার দিকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মীনা বাজারের সামনে তাঁরা সমবেত হন। তবে পুলিশের কঠোর বাধার মুখে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিটি তাঁরা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ সেখান থেকে একজনকে আটক করে নিয়ে যায়।
সংস্কৃতিকর্মীদের এই কর্মসূচি সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিল পুলিশ। ফলে বেলা সাড়ে তিনটা থেকেই ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের মীনা বাজার এলাকায় শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিকেল চারটার দিকে ‘প্রতিবাদী শিল্পী জনতা’র ব্যানারে কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী সেখানে জড়ো হন। তাঁদের দাবি ছিল, ‘দেশের নানা স্থানে বাউলগানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজন তৌহিদি জনতার নামে সন্ত্রাসীদের হামলা ও আগ্রাসনের প্রতিবাদে’ তাঁরা এই মানববন্ধন করতে চেয়েছিলেন।
ঘটনাস্থলে পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি দেখে নাট্যকর্মী সুমনা ইসলাম পুলিশের কাছে জানতে চান, তাঁরা সেখানে মানববন্ধন করতে পারবেন কি না। তাঁর সঙ্গে দীপক শীল নামের আরেকজন ব্যক্তি পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে যান। কথোপকথনের একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের বলতে শোনা যায়, ওপর থেকে কিছু নির্দেশনা এসেছে, যাতে মানববন্ধনকারীরা কোনো উসকানিমূলক কথা বা স্লোগান না দেন।
ততক্ষণে উপস্থিত পুলিশ কর্মকর্তারা আরও উল্লেখ করেন যে, কিছুদিন আগে এই একই স্থানে একদল জনতা মানববন্ধন করে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছিল। এই কথা শুনে দীপক শীল পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘কেন, জয় বাংলা স্লোগান কি নষ্ট হয়ে গেছে নাকি। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ও তো এই স্লোগান দিয়েছি।’ এই উত্তরের পর পুলিশ দীপক শীলের পরিচয় জানতে চায়। কথা বলার একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে দীপকের কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং পুলিশ তাঁকে আটক করে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলে।
আটক হওয়া দীপক শীল বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। তাঁকে পুলিশের গাড়িতে তোলার সময় সুমনা ইসলাম বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার পর সুমনা ইসলাম পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তখন পুলিশ তাঁর ওপরও চড়া হয়। তাঁকেও টানাহেঁচড়া করেছে, এমনটা পুলিশ কোনো নারীর সঙ্গে করতে পারে না।
পুলিশ কোনো কারণ ছাড়াই দীপক শীলকে আটক করেছে বলে দাবি করে সুমনা ইসলাম বলেন, ‘আমরা এর প্রতিবাদ জানাই। অবিলম্বে দীপকের মুক্তি চাই।’
এই পুরো ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ ইবনে মিজান জানান, ‘আমরা তাঁদের উসকানিমূলক স্লোগান ও কথা বলতে নিষেধ করলে তাঁরা পাল্টা প্রশ্ন করেন, জয় বাংলা স্লোগান নষ্ট হয়ে গেছে কি না। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে একজনকে প্রাথমিকভাবে আটক করা হয়েছে।’
পুলিশের সঙ্গে টানাহেঁচড়া এবং একজনকে আটকের পর বিকেল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে মানববন্ধনকারীরা সেখানে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন। তাঁরা ‘মৌলবাদীদের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘সংস্কৃতির ওপর হামলা, ঘুরে দাঁড়াও বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ প্রভৃতি স্লোগান দেন।
মানববন্ধনের আয়োজকদের একজন ফারুক এইচ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ ধরনের অবস্থান কর্মসূচিও যদি কেউ সহ্য করতে না পারে, তাহলে আমাদের করার আর কিছু নাই। সারা দেশেই বাউল ও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আক্রমণ চলছে। আমরা এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে মানববন্ধনকারীরা ওই এলাকা ত্যাগ করেন।