বর্তমানে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এক অভূতপূর্ব প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ঢেউ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই গণআন্দোলনগুলোকে মূলত ‘জেন–জি প্রতিবাদ’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে রয়েছেন মূলত ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণরা, যারা তাঁদের প্রজন্মের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করা বিভিন্ন সংকট ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহ আগে দেশটির স্কুলগুলোর চরম অর্থসংকটে শোচনীয় হয়ে পড়ার প্রতিবাদে এই আন্দোলন শুরু হয়। সময়ের সাথে সাথে এই বিক্ষোভের তীব্রতা আরও বেড়েছে। প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে প্রায় ৫ থেকে ৮ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ভারতে ‘ককরোচ’ আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং গত সপ্তাহে এই আন্দোলনের প্রধান নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্পেনের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, ভঙ্গুর আবাসনব্যবস্থা এবং উচ্ছেদ ঠেকাতে আইনের ব্যর্থতা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অসন্তোষ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতির সূত্রপাত হয় ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাজকালকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার মাধ্যমে। পরবর্তীতে স্প্যানিশ সংসদে পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ থেকে রক্ষা করার একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিল খারিজ হয়ে যায়, যা প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে আগাম নির্বাচন ঘোষণা করতে বাধ্য করে। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, উচ্ছেদের ঠিক দুই সপ্তাহ পরেই মারিকারমেন মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও, এই প্রতিবাদী ঢেউয়ের মূলে রয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। এই বৈষম্য মূলত দুটি স্তরে বিভক্ত—একটি শ্রেণিগত এবং অন্যটি প্রজন্মগত।
ইউরোপের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর থেকে বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ক্রমবর্ধমান আয়বৈষম্য এবং সম্পদের কেন্দ্রীভূত হওয়ার মাধ্যমে এটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এক সময় ইউরোপের যেসব রাষ্ট্র তাঁদের জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থার জন্য গর্ব করত, বর্তমানে সেই ব্যবস্থার ক্ষয় তরুণদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
একটা সময়ে উচ্চমানের সরকারি পরিষেবা সবার জন্য জীবনযাত্রার একটি সর্বনিম্ন মান নিশ্চিত করত এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে সফল হওয়ার সমান সুযোগ বা মেধাতন্ত্র তৈরি করত। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে সরকারি ব্যয় ছাঁটাইয়ের ফলে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো মৌলিক সেবা দেওয়ার সামর্থ্য রাষ্ট্র হারিয়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার এই পশ্চাদপসরণের ফলে আয় ও সম্পদের বৈষম্য আরও প্রকট হয়েছে। কারণ, সামর্থ্যবানরা অর্থ খরচ করে ভালো সেবা নিতে পারলেও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ওপর, যা তাঁদের অন্যান্য চ্যালেঞ্জগুলোকে আরও জটিল করে তুলছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় বা শাসনে চরম ব্যর্থতার কারণে তরুণেরা এখন তাঁদের মা-বাবা ও দাদা-দাদিদের আমলের চেয়ে অনেক বেশি অনিশ্চিত ও অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র অর্থসংকটের কারণেই সাম্প্রতিক ‘পিসা’ ফলাফলে শিক্ষার্থীদের পড়া ও গণিতের দক্ষতায় মারাত্মক ধস নেমেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এই অবনতির পেছনে সাধারণ ব্যাখ্যা হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং স্কুলে অনুপস্থিতিকে দায়ী করা হয়, যার অন্যতম কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে চিহ্নিত করা হয়।
শিক্ষাগত যোগ্যতার এই অবনতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর দ্রুত ব্যবহার। এটি মূলত সুশাসনেরই একটি বড় ব্যর্থতা। সোশ্যাল মিডিয়া এবং এআই—উভয়কেই নিয়মনীতির আওতায় আনার প্রচেষ্টা অত্যন্ত ধীরগতির এবং প্রযুক্তি জায়ান্টদের শক্তিশালী লবিংয়ের কারণে তা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এআই-বিপ্লব কর্মসংস্থানের বাজারে তরুণদের ক্যারিয়ার শুরুর ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যদিও কর্মসংস্থানে এআই-এর পূর্ণ প্রভাব কেবল শুরু হয়েছে, তবে এখনই এটি স্পষ্ট যে এন্ট্রি-লেভেলের বা প্রাথমিক স্তরের কাজগুলো মানুষ বাদ দিয়ে ক্রমে যন্ত্র বা প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
আবাসন জীবনের অন্যতম মৌলিক চাহিদা, যেখানে তরুণেরা ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। বর্তমান প্রজন্মের তরুণদের তাঁদের আয়ের একটি বিশাল অংশ বাড়িভাড়ার পেছনে ব্যয় করতে হয়, যা পূর্ববর্তী যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি। এটিও স্পষ্টত শাসনব্যবস্থারই এক ব্যর্থতা।
সবকিছুর ওপর যোগ হয়েছে জলবায়ু সংকট, যা সম্ভবত শাসনব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার রূপ। আইপিসিসি-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে ২০২০ সালে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের জীবন তাদের মা-বাবা ও দাদা-দাদিদের জীবনের তুলনায় কতটা বেশি অনিশ্চিত ও ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।
বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আসা যেকোনো অস্থিরতা সম্মিলিতভাবে মোকাবিলার ক্ষেত্রে অনেক ভালো অবস্থানে থাকে। কিন্তু তার বিপরীতে আমরা যে চরম বৈষম্যমূলক সমাজ দেখতে পাচ্ছি, সেখানে অভিযোজন বা খাপ খাইয়ে নেওয়ার পুরো বোঝা ব্যক্তি ও পরিবারের কাঁধেই গিয়ে পড়ে।
সহজ কথায়, শাসনব্যবস্থার একাধিক ব্যর্থতা এবং রাষ্ট্রের সেবা দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে তরুণদের মধ্যে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্যারিস, নয়া দিল্লি, রোম এবং মাদ্রিদের রাজপথে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ আসলে এরই বহিঃপ্রকাশ।
যথারীতি, সরকারের প্রধান প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে দমন-পীড়ন। এটি প্রতিবাদের অধিকারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং কঠোর হাতে দমনের বৈশ্বিক ধারারই অংশ। আন্দোলনবিরোধী আইন জারি, গণগ্রেপ্তার বা পুলিশি সহিংসতা—যেভাবেই হোক, দমননীতি বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। এই ধরনের দমন-পীড়ন মাঝে মাঝে কোনো আন্দোলনকে থামিয়ে দিতে পারলেও, অনেক ক্ষেত্রে তা আন্দোলনকে আরও উসকে দেয়। ফ্রান্স ও ভারত উভয় ক্ষেত্রেই এখন পর্যন্ত এটাই ঘটেছে।
প্রকৃতপক্ষে যা দরকার তা হলো “তরুণদের রাজপথে নামতে বাধ্য করা বৈষম্য এবং শাসনের ব্যর্থতাগুলোকে দূর করার সৎ উদ্যোগ। এগুলো সমাধান না করলে রাজনৈতিক সংকট দিন দিন ঘনীভূত হতে বাধ্য।”
— অস্কার বার্গলান্ড, জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক অ্যান্ড সোশ্যাল পলিসি, ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়। (আল–জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত)