ভারতের রাজপথে বর্তমানে এক পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে গত কয়েক মাসে ‘জেন–জি’ প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে যে তীব্র ক্ষোভ ও আন্দোলন দানা বেঁধেছে, সেই প্রতিবাদের প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছেন ২৯ বছর বয়সী এই বামপন্থী ছাত্রনেত্রী। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা ছাড়িয়ে তিনি এখন ভারতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।

গত ১২ অক্টোবর ভারতের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধী হাজার হাজার সমর্থককে সঙ্গে নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অভিমুখে পদযাত্রা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের দাবিতে আদালতে একটি আবেদন জমা দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। সেই পদযাত্রার সময় দেখা যায়, রাহুল গান্ধী সামনে থাকা দুই নারীর কাঁধে হাত রেখে হাঁটছেন। ওই দুই নারীর একজন ছিলেন রাহুলের চেয়ে দুই বছরের ছোট বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। রাহুল গান্ধী তাঁর বোনকে নিজের ‘সবচেয়ে ভালো বন্ধু’ ও সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগী বলে অভিহিত করেছেন। আর অপরজন ছিলেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। উল্লেখ্য, কয়েক মাস আগেও ছাত্ররাজনীতির গণ্ডির বাইরে নেহা বোরার নাম খুব একটা পরিচিত ছিল না।

টানা ১২ বছর ক্ষমতায় থাকার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একের পর এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পর ‘জেন–জি’ প্রজন্মের তরুণদের তীব্র আন্দোলনের মুখে তিনি তাঁর শিক্ষামন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে বাধ্য হন। এবার ভোটার তালিকার বিতর্কিত সংশোধনের ফলে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়ার অভিযোগ সামনে আসায় মোদি সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তরুণরা।

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে কয়েক মাস ধরে বিক্ষোভ চালিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা বোরা খুব দ্রুতই মোদির ক্ষমতার বিরুদ্ধে তরুণদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতিবাদী মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

নেহা বোরা ছিপছিপে গড়নের, কালো চুল এবং তাঁর কণ্ঠস্বর বেশ গম্ভীর ও বলিষ্ঠ। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতারা প্ল্যাকার্ড হাতে অবস্থান ধর্মঘট করলেও পুলিশ সহজেই তাঁদের ধরে ফেলে। কিন্তু নেহা নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এক বিশেষ কৌশল রপ্ত করেছেন। রাজপথের এই কৌশলী কর্মপদ্ধতির কারণে মোদি সরকারের নীতি এবং বিভিন্ন পদে নিয়োগ নিয়ে ক্ষুব্ধ তরুণদের কাছে তিনি এক আইকনে পরিণত হয়েছেন।

এই জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতায় সফটওয়্যার ডেভেলপাররা নেহাকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের একটি ভিডিও গেম তৈরি করেছেন। সেখানে গেমের প্রধান চরিত্র পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে এবং পুলিশকে এড়িয়ে ছুটে চলে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা নেহার বিভিন্ন প্রতিবাদ ও পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্য দিয়ে রিলস তৈরি করছেন, যা লাখ লাখ মানুষ দেখছেন এবং হাজার হাজার ব্যবহারকারী শেয়ার করছেন। এমনকি রাহুল গান্ধীর মতো বিরোধী নেতারাও আক্ষরিক অর্থেই এই তরুণ নেত্রীর কাঁধে ভর দিয়েছেন।

দিল্লির ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ চলতি মাসের শুরুতে সেন্ট্রাল দিল্লিতে বসে বলেন, ‘আমরা কি নেহাকে “গণতন্ত্রের দেবী” বলতে পারি?’ তিনি হংকংয়ের আন্দোলনকারী নেত্রী অ্যাগনেস চাউয়ের সঙ্গে নেহার তুলনা করেন। বেইজিংয়ের চাপিয়ে দেওয়া যেসব আইনকে সমালোচকেরা কঠোর ও দমনমূলক বলে অভিহিত করেছিলেন, তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করে অ্যাগনেস এই উপাধি পেয়েছিলেন। তবে রাজনৈতিক নেতাকে দেবতার আসন থেকে নামিয়ে আনার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও নেহা বোরা নিজের সঙ্গে এমন তুলনা চান না।

নেহা দিল্লির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক দশক ধরে শিল্পকলায় পড়াশোনা করেছেন। বর্তমানে তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নাট্যকলায় পোস্টডক্টরাল পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। কয়েক দশক ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজনৈতিক আন্দোলন ও সক্রিয়তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। জেএনইউ-তে পড়ার সময় নেহা বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনে (আইসা) যোগ দেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে জেএনইউর রাজনীতিতে বড় প্রভাব ধরে রেখেছে এই সংগঠনটি।

নেহা বর্তমানে আইসার সর্বভারতীয় সভাপতি। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ককরোচ আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে যন্তর মন্তরে কয়েক সপ্তাহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তবে চলতি মাসের শুরুতে তিনি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন।

গত ১০ অক্টোবর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তখন মোদি সরকার কার্যত পুরো নয়াদিল্লি অবরুদ্ধ করে ফেলে। পুলিশ ট্রেন ও বাসে আসা আন্দোলনকারীদের দ্রুত আটক করে এবং অনেক ছাত্রনেতাকে নিজ নিজ বাড়িতে নজরবন্দী করা হয়। এমনকি উড়োজাহাজে রাজধানীতে পৌঁছামাত্রই ককরোচ আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের পুলিশ আটক করে। তবে নেহা তখন পুলিশের নাগালের বাইরে ছিলেন।

নেহা বিখ্যাত পাকিস্তানি শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খানের কাওয়ালি শুনতে ভালোবাসেন। তাঁর বন্ধুরা জানান, এই তরুণ বামপন্থী নেত্রী নিজেও ভালো গান করেন এবং ডাফলি বাজাতে পারেন। সেদিন বিকেলে নেহা ইনস্টাগ্রাম লাইভে আসেন। বিশ্বজুড়ে জেন–জি প্রজন্মের প্রতিবাদের প্রতীক অ্যানিমে ‘ওয়ান পিস’–এর টি–শার্ট পরে তিনি দক্ষিণ দিল্লির অভিজাত এলাকায় উপস্থিত হন। পুলিশের ব্যারিকেড থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে কয়েক শ মানুষকে নিয়ে তিনি মিছিল শুরু করেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর পুলিশ ধাওয়া করে নেহাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায় এবং কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেয়।

নেহার রাজপথের রাজনীতি বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে। ১৯৯০ সালের আগস্টে গঠিত হয় আইসা, যা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী–লেনিনবাদী) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন। দলটির উত্থান ঘটে ১৯৬৭ সালে পূর্ব ভারতে শুরু হওয়া মাওবাদী নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিদ্রোহের ধারায়। পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রামের কৃষক বিদ্রোহ ছিল সেই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা এবং ওই গ্রামের নাম থেকেই আন্দোলনকারীদের ‘নকশাল’ পরিচিতি আসে।

রাষ্ট্রীয় দমন–পীড়নের মুখে দলটি অন্তত তিন দশক গোপনে কাজ করেছে। ১৯৯০–এর দশকে তারা সশস্ত্র পথ ত্যাগ করে সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় যুক্ত হয়, যদিও তাদের কিছু ভাঙনধারা এখনো সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পক্ষপাতী। মূল ধারার দলটি সময়ের সঙ্গে বদলালেও অতীতের সেই সাংগঠনিক দক্ষতার কিছু কৌশল তারা ধরে রেখেছে। ১০ অক্টোবর পুলিশ তরুণ নেতাদের আগেই আটক করার জন্য তৎপর হবে জেনে আইসার কর্মীরা নেহাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

নেহার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আইসার ২৫ বছর বয়সী ছাত্রনেতা দানিশ আলী বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে আমাদের দল দীর্ঘদিন গোপনে পরিচালিত হতো। আমরা সেই একই ধারা অনুসরণ করেছি, সেটা অনেকটা গেরিলা কৌশলের মতো।’ দানিশ আরও জানান, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিপ্লবী ভগত সিং যেসব প্রতিরোধ কৌশল ব্যবহার করেছিলেন, দল এখনো সেসব কৌশলের ওপর আস্থা রাখে। ১৯৩১ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে ব্রিটিশ শাসকেরা ভগত সিংকে ফাঁসি দিয়েছিল।

ভগত সিং স্বঘোষিত মার্ক্সবাদী হলেও ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষের কাছে তিনি পরম শ্রদ্ধার পাত্র। অন্যদিকে মোদির হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি বাম রাজনীতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতের সংসদ ও বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভাতেও বাম দলগুলো বড় ধরনের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করার পর গত আগস্টে স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি ‘আরবান নকশাল’ বা ‘বুদ্ধিজীবী নকশালদের’ বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দেন। বিজেপি বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘরানার বিরোধী পক্ষ ও সমালোচকদের বর্ণনা দিতে নিয়মিত এই শব্দগুলো ব্যবহার করে।

নেহার মতে, বিজেপি বামপন্থীদের ভয় পায় বলে এমন বক্তব্য দেয়। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘ভারতের স্বাধীনতা এনে দেওয়া বিপ্লবী ধারার প্রকৃত উত্তরসূরিদের গ্রহণযোগ্যতা অস্বীকার না করলে আপনারা কীভাবে নিজেদের জাতীয়তাবাদের প্রধান প্রবক্তা দাবি করবেন?’

ভারতের উত্তরাখন্ডের খাতিমা নামের এক ছোট শহরে নেহার জন্ম। তাঁর বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। বাবার চাকরির সুবাদে তাঁর পরিবার জম্মু, বেঙ্গালুরু, অমৃতসর, লক্ষ্ণৌসহ বিভিন্ন শহরে বসবাস করেছে। কৈশোরে পরিবারের সঙ্গে নেহার রাজনৈতিক মতপার্থক্য বাড়তে থাকে, কারণ তাঁর বাবা–মাসহ অন্য সদস্যরা বিজেপির সক্রিয় সমর্থক। একপর্যায়ে বাবা–মায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে দূরত্বও তৈরি হয় তাঁর। এরপর কয়েক মাস আগে যন্তর মন্তরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সংহতি জানিয়ে নেহা টানা ২৩ দিন অনশন করেন।

অনশন চলাকালের এক স্মৃতির কথা উল্লেখ করে নেহা বলেন, হাজারো মানুষের ভিড়ের মধ্য থেকে একজন এসে তাঁকে বলেছিলেন, ‘বাইরে একজন নারী নিজেকে আপনার মা বলে পরিচয় দিচ্ছেন। তাঁকে কি ভেতরে আসতে দেব?’ পরে তাঁর মা ভেতরে এসে স্নেহের পরশে নেহার পায়ে হাত বুলিয়ে দেন।

সফটওয়্যার ডেভেলপাররা নেহাকে নিয়ে সুপার মারিও ধাঁচের ভিডিও গেম তৈরি করেছেন। সেখানে গেমের চরিত্রটি পুলিশের ব্যারিকেড টপকে ‘গণতন্ত্র পয়েন্ট’ সংগ্রহ করে এবং পুলিশকে এড়িয়ে ছুটে চলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভক্তরা নেহার বিভিন্ন প্রতিবাদ ও পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার দৃশ্য জুড়ে রিলস তৈরি করছেন।

আইসার জ্যেষ্ঠ নেতা ও নেহার পরামর্শক এন সাই বালাজি বলেন, এই অনশনই নেহাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। এর ফলে সাধারণ মানুষ তাঁর বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। বালাজি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গে হতাশ ভারতের উন্নত জীবনের প্রত্যাশী মানুষেরা নেহার মতো নিঃস্বার্থ আন্দোলনকারীদের মধ্যে আশার সন্ধান পেয়েছেন। সেখানেই যাবতীয় অপপ্রচারের প্রভাব মুছে গেছে। তখন তথাকথিত “দেশবিরোধীরাও” মানুষ হিসেবে সহানুভূতি পান।’

মোদি সরকারের সমর্থকেরা সাধারণত সমালোচক ও রাজনৈতিক বিরোধীদের ইঙ্গিত করতে ‘দেশবিরোধী’ তকমাটি ব্যবহার করেন। নেহার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্বমূলক বলে বিবেচিত নাগরিকত্ব আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তাঁর রাজনৈতিক জাগরণ ঘটে। সেই আন্দোলন থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের বিকাশ শুরু হয়।

দানিশ আলী বলেন, জেএনইউ-তে পড়ার সময় নেহা বছরের পর বছর প্রতিটি কক্ষে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করেছেন, প্রচারপত্র বিলি করেছেন এবং আইসার পক্ষে ভোট চেয়েছেন। নেহার জীবনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে রাজনীতি। তিনি ওমর খালিদ ও শারজিল ইমামের মতো মুসলিম রাজনৈতিক বন্দীদের পক্ষেও সব সময় সোচ্চার। এই দুই তরুণ নেতা বিচার ছাড়াই ছয় বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে বন্দী রয়েছেন। দানিশের মতে, নেহা ‘সাহসী ও স্পষ্টভাষী’।

১০ অক্টোবরের ঘটনাই শেষ নয়। ওই সপ্তাহে আরও কয়েকবার পুলিশের চোখ এড়িয়ে দিল্লির বিভিন্ন স্থানে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভ করেন নেহা। প্রতি সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ত। পুলিশের শক্ত বাঁধন থেকে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা, ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে বিজয়ের চিহ্ন দেখানো কিংবা নারী পুলিশদের হাতে আটক হওয়ার নানা দৃশ্য তখন ছড়িয়ে পড়ে।

নেহা বিখ্যাত পাকিস্তানি শিল্পী নুসরাত ফতেহ আলী খানের কাওয়ালি শুনতে ভালোবাসেন। বন্ধুরা জানান, এই তরুণ বামপন্থী নেত্রী নিজেও ভালো গান করেন এবং ডাফলি বাজাতে পারেন। আগের প্রজন্মের অনেক বামপন্থীর বিরুদ্ধে মার্ক্সবাদকে অতিরিক্ত মতবাদনির্ভর ও তাত্ত্বিকভাবে প্রয়োগ করার অভিযোগ থাকলেও নেহা নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি। বালাজির মতে, ইন্টারনেট যুগে বেড়ে ওঠা এই ছাত্রনেত্রী তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের ভাষা খুব ভালো বোঝেন।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেহার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলেও ভারতীয় রাজনীতিতে স্থায়ী জায়গা করে নিতে যেকোনো বাম ছাত্রনেতাকে বড় ধরনের প্রতিকূলতার মুখে পড়তে হয়। প্রথমত, আইসার প্রভাব মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এবং উত্তর ভারতের কিছু নির্দিষ্ট ছাত্রাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ। তাদের মূল দল সিপিআই (এমএল) লিবারেশনও জাতীয় রাজনীতিতে ছোট একটি দল। দলটির সংসদে মাত্র দুজন সদস্য রয়েছেন এবং তাঁরা দুজনই পূর্ব ভারতের বিহার রাজ্যের প্রতিনিধি। দলটি কখনো এককভাবে কোনো রাজ্য শাসন করেনি।

নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলী বলেন, ‘ছাত্রনেতাদের ক্যাম্পাস থেকে সরাসরি সংসদীয় নির্বাচনী এলাকার রাজনীতিতে নিয়ে যাওয়ার মতো শক্ত ভিত আইসার নেই।’ তাঁর মতে, ভারতের নির্বাচনী রাজনীতিতে জিততে হলে নির্দিষ্ট ভৌভৌগোলিক এলাকায় নিজস্ব নির্ভরযোগ্য ভোটব্যাংক থাকতে হয়, নেহার তা নেই। আসিম আলী আরও বলেন, নেহার মতো তরুণ নেতাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে আসার একটি উপায় হলো কংগ্রেসের মতো মূলধারার কোনো বড় জাতীয় দলে যোগ দেওয়া। অতীতে অনেক বাম ছাত্রনেতাই এই পথ বেছে নিয়েছেন। তবে সেখানেও নিজস্ব সংকট রয়েছে। কংগ্রেসের মতো বড় দলে প্রতিষ্ঠিত নেতাদের প্রভাব ডিঙিয়ে কেবল ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে জায়গা করে নেওয়া সহজ নয়।

তবে নেহা তাঁর বামঘেঁষা দলের সঙ্গে থাকুন বা কংগ্রেসের মতো দলের কাছাকাছি যান, তিনি যে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে তরুণ ভোটারদের মধ্যে শক্ত সমর্থন গড়ে তুলছেন, তা স্পষ্ট। বিশ্লেষক অসীম আলীর মতে, ভারতের পটভূমিতে একে প্রচলিত অর্থে ‘ভোটব্যাংক’ বলা না গেলেও নেহার পেছনে তরুণ ভোটারদের একটি বাস্তব সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিশিতা নাথ আইসার সদস্য নন, কিন্তু তিনি নেহার একনিষ্ঠ সমর্থক। তিনি প্রায়ই রাজপথে নেহার সঙ্গে মিছিলে তাল মিলিয়ে ছোটেন। গত সপ্তাহে নিশিতা প্রতিদিন সকালে নিজের পাড়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়ানোর অনুশীলন করেছেন। লক্ষ্য একটাই, তিনি যেন নেহার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দৌড়াতে পারেন।

নিশিতা বলেন, ‘নেহা যেভাবে কথা বলেন, তাঁর কণ্ঠের ওঠানামা, বাতাসে উড়তে থাকা চুল, কী আর বলব, আমার ইনস্টাগ্রামজুড়ে শুধুই নেহা। গত সপ্তাহের আন্দোলনে নেহা দৌড়ানোর সময় তাঁর হাত ধরতে পারাটা আমার জন্য সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত ছিল।’

মূলধারার বিরোধী দল, ককরোচ আন্দোলন ও ছাত্রসংগঠনগুলোর অব্যাহত চাপে রয়েছে মোদি সরকার। ফলে এই অস্থির পরিস্থিতি শিগগির কাটছে না। বিশ্লেষক আসিম আলীর মতে, নেহাও রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন না। তিনি বলেন, নেহা ভারতের রাজনীতিতে নতুন একটি জায়গা তৈরি করে নিচ্ছেন। আসিম আলীর মন্তব্য, ‘নেহা ক্ষণিকের কোনো চমক নন, তিনি রাজনীতিতে থেকে যাবেন।’