বেলজিয়ামের ক্লাব ব্রুগার হয়ে বর্তমানে দুর্দান্ত ফর্মে চলা নিকোলা ত্রেসোল্ডিকে খুব বেশিদিন ধরে নিজেদের সাথে রাখতে পারবে না বলে মনে করা হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের জায়ান্ট ক্লাব আর্সেনাল, চেলসি এবং ম্যানচেস্টার সিটি বেশ কিছুদিন ধরেই এই তরুণ স্ট্রাইকারের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। তবে গত কয়েক সপ্তাহে ত্রেসোল্ডি মাঠের যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন, তাতে আগামী জানুয়ারির দলবদল বাজারেই বেলজিয়ামের ক্লাবটি থেকে তাঁকে সরিয়ে নিতে পারে যেকোনো বড় দল।

গত চার সপ্তাহের ব্যবধানে মোট ছয়টি ম্যাচ খেলেছেন ত্রেসোল্ডি। অবাক করা বিষয় হলো, এর মধ্যে তিনটি ম্যাচে তিনি হ্যাটট্রিক করেছেন। এই তিনটি হ্যাটট্রিক কোনো একটি নির্দিষ্ট লিগে নয়, বরং তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিযোগিতায় এবং দুটি ভিন্ন দলের হয়ে করা। ৩০ সেপ্টেম্বর ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-২১ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইপর্বে মাল্টার বিপক্ষে জার্মানির অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে প্রথম হ্যাটট্রিক করেন তিনি। এরপর ১৩ অক্টোবর চ্যাম্পিয়নস লিগে ইন্টার মিলানের বিপক্ষে মাঠে নেমে ফের তিনটি গোল করেন। সর্বশেষ গত শনিবার বেলজিয়ান প্রো লিগে সিন্ট-ট্রুইডেন্সের বিপক্ষে তৃতীয় হ্যাটট্রিকটি সম্পন্ন করেন তিনি। তিন ভিন্ন প্রতিযোগিতা, দুই ভিন্ন দল এবং মাত্র ২৬ দিনের ব্যবধানে তিনটি হ্যাটট্রিক!

যেহেতু একটি হ্যাটট্রিক বয়সভিত্তিক দলের হয়ে করা, তাই দ্রুততম তিন হ্যাটট্রিকের আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে তাঁর নাম হয়তো উঠবে না। তবে গোল করার এই অবিশ্বাস্য খরায় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলো জানুয়ারির ট্রান্সফার উইন্ডোতেই ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে ক্লাব বদলের চেয়েও বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জাতীয় দলের পরিচয়। ২০০৪ সালে ইতালির সার্দিনিয়া দ্বীপের কালিয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেছেন ত্রেসোল্ডি। তাঁর বাবা এমানুয়েল ত্রেসোল্ডি নিজেও একজন ফুটবলার ছিলেন এবং সিরি ও ক্লাব আতালান্তাতে খেলেছেন। বাবার অবস্থান ছিল রক্ষণভাগে, অর্থাৎ তিনি ছিলেন ডিফেন্ডার; আর ছেলে নিকোলা হয়ে উঠেছেন আক্রমণভাগের প্রাণ বা স্ট্রাইকার। বাবা গোল আটকাতেন, আর ছেলে এখন গোল করছেন!

অন্যদিকে তাঁর মা বারবারা কাফি আর্জেন্টাইন বংশোদ্ভূত। ফলে ইতালি ও জার্মানির পাশাপাশি আর্জেন্টিনার হয়েও খেলার আইনি সুযোগ রয়েছে ত্রেসোল্ডির। ইতালিতেই তাঁর শৈশব ও বেড়ে ওঠা। তবে ২০১৭ সালে মায়ের চাকরির কারণে পরিবারের সাথে জার্মানির হ্যানোভারে চলে যান তিনি। সেখান থেকেই তাঁর ফুটবল জীবনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

হ্যানোভার ৯৬-এর যুব একাডেমিতে তাঁর যাত্রা শুরু। ২০২০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে অনূর্ধ্ব-১৭ দলের হয়ে তিন ম্যাচে পাঁচ গোল করে চমক দেখান তিনি। ইতালির গোলডটকমের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, যুব পর্যায়ে প্রতি মৌসুমে প্রায় ২০টি গোল করার ক্ষমতা রাখেন তিনি। এরপর জার্মানির অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ডাক পান এবং ২০২২ সালে পেশাদার চুক্তি স্বাক্ষর করেন। হ্যানোভারের হয়ে দ্বিতীয় বিভাগে টানা তিন মৌসুম খেলার পর ২০২৫ সালের জুনে তিনি ক্লাব ব্রুগায় যোগ দেন। আর সেখান থেকেই তিনি এখন ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর নজরে এসেছেন।

বর্তমানে জার্মানির অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে খেলছেন ত্রেসোল্ডি। ২০২৬ বিশ্বকাপের কথা মাথায় রেখে জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগলসমান তাঁকে দলে নেওয়ার কথা বিবেচনা করেছিলেন। কোচ নাগলসমান বলেছিলেন, “জার্মানির যে ধরনের নম্বর নাইন দরকার, ত্রেসোল্ডি তা–ই।” তবে বিভিন্ন সমীকরণের কারণে শেষ পর্যন্ত তাঁকে ডাকা হয়নি। অন্যদিকে, ইতালি চাইলে এখনই তাঁকে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।

ইতালির জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম গাজেত্তা দেলো স্পোর্তের তথ্য অনুযায়ী, ইতালির কোচ রবার্তো মানচিনি এবং জার্মানির কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপার—উভয়েই ত্রেসোল্ডির সাথে কথা বলেছেন। দুই দেশের ফুটবল কর্মকর্তারাও তাঁর সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

যদিও তাঁর বংশগতভাবে আর্জেন্টিনার সাথে যোগসূত্র রয়েছে, তবে লিওনেল মেসির দেশ আপাতত এই দৌড়ে খুব একটা আলোচনায় নেই। স্প্যানিশ ভাষায় সাবলীল ত্রেসোল্ডির সামনে এখন মূলত দুটি পথ—ইতালি অথবা জার্মানি। গত সেপ্টেম্বরে তিনি জানিয়েছিলেন, দুই দেশই তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আগে বুঝতে চান, কোন দেশের পরিকল্পনায় তাঁর জন্য কতটুকু জায়গা রাখা হয়েছে। তাই জাতীয় দলের বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত এখনো “৫০-৫০”।

গোলপোস্টের সামনে সিদ্ধান্ত নিতে ত্রেসোল্ডির খুব একটা সময় লাগে না; বল পায়ে পেলেই তিনি জানেন কোথায় নিখুঁতভাবে আঘাত করতে হবে। তবে মাঠের বাইরের জীবনের ঠিকানাটি তিনি এখনো চূড়ান্ত করতে পারেননি।