শহরের ইটপাথরের খাঁচায় বন্দি শৈশব নয়, বরং পাহাড়ের সবুজ উপত্যকায় বেড়ে ওঠা এক লড়াকু কিশোরীর নাম ফুলকলি ত্রিপুরা। বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলী আলোর পাঠশালার সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী বর্তমানে ফুটবলের এক অপার সম্ভাবনাময় নাম হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। বাঁশের তৈরি গোলপোস্ট আর সিমেন্টের ইটের টুকরোকে গোলবার বানিয়ে প্রতিদিন বিকেলে ঘাম ঝরাচ্ছে সে। তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য—একদিন জাতীয় দলের গোলবার সামলানো।
ফুলকলির ফুটবলের এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। শহরের মেয়েদের মতো নামিদামি বুটজোড়া কিংবা কোনো পেশাদার অ্যাকাডেমির সুযোগ তার ভাগ্যে জোটেনি। ফুটবলের প্রতি তার এই গভীর অনুরাগ শুরু হয় মূলত স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে। পরবর্তীতে ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উপজেলা পর্যায়ে খেলতে গিয়ে সে এক বিশেষ উপলব্ধি করে। সে লক্ষ্য করে যে, সবাই যখন বল জালে জড়িয়ে গোল করতে ব্যস্ত, তখন তার আনন্দ লুকিয়ে থাকে দারুণ সব শট ঠেকিয়ে গোল বাঁচানোর মাঝে। তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় শিক্ষক চৌনি মারমার একটি কথায়। শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, “তোমার হাত দুটো অনেক লম্বা, গোলকিপার হিসেবে তোমাকে দারুণ মানাবে।” এরপর থেকেই সে স্ট্রাইকারের ভূমিকা ছেড়ে হয়ে ওঠে দলের শেষ প্রাচীর বা গোলরক্ষক।
কোনো পেশাদার কোচ না থাকলেও থেমে থাকেনি ফুলকলির স্বপ্ন। স্কুলের শারীরিক ক্রীড়া শিক্ষকের তত্ত্বাবধান এবং জাতীয় দলের গোলরক্ষক রুপনা চাকমার ভিডিও দেখে সে একা একাই ডাইভ দেওয়া ও বল ধরার কৌশল আয়ত্ত করেছে। পাহাড়ি মেয়ে রুপনা চাকমাই তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ফুলকলি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে, “রুপনা দিদিও তো আমার মতো পাহাড়ের মেয়ে। তিনি যদি জাতীয় দলের গোলবার সামলাতে পারেন, আমি কেন পারব না?”
বর্তমানে তার চোখ সুদূর প্রসারি লক্ষ্যে। প্রথমে জেলা দলে সুযোগ পাওয়া, এরপর ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার বিভাগীয় পর্যায়ে নিজের মেধার প্রমাণ দেওয়া, বিকেএসপি এবং সবশেষে লাল-সবুজ জার্সিতে জাতীয় দলের হয়ে দেশের প্রতিনিধিত্ব করা। কোটি মানুষের সামনে জাতীয় সংগীতের সময় গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করার সেই সোনালী দিনের অপেক্ষাতেই দিন গুনছে ফুলকলি ত্রিপুরা।