প্রকৃতিপ্রেমী ও পাখি পর্যবেক্ষকদের জন্য এক বিশেষ প্রাপ্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে সিলেটের কানাইঘাট। সম্প্রতি এই এলাকায় দেখা মিলেছে অত্যন্ত দুর্লভ পরিযায়ী পাখি বঘেরির। এর আগে টাঙ্গুয়ার হাওর এবং মৌলভীবাজারের কুরমায় এই পাখিটি দেখা গেলেও, দীর্ঘ বিরতির পর কানাইঘাটে এর উপস্থিতি পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্মৃতিচারণ করে জানা যায়, ২০২২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রৌদ্রোজ্জ্বল এক বিকেলে প্রথমবার টাঙ্গুয়ার হাওরের চটাইন্না খালপাড়ে এই কালচে মুখের দুর্লভ পাখিগুলোর দেখা মেলে। সেই সময়ে তাদের বেশ কিছু চমৎকার ছবি তোলা সম্ভব হয়েছিল। পরবর্তীতে একই বছরের ২৫ নভেম্বর মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা চা-বাগানের একটি ছোট পক্ষী অভয়াশ্রমে তাদের আরও কিছু সুন্দর ছবি তোলা হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত হার্ডড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেই মূল্যবান ছবিগুলো চিরতরে হারিয়ে যায়। এরপর বঘেরির খোঁজে বেশ কয়েকবার টাঙ্গুয়ার হাওর ও কুরমায় যাওয়া হলেও আর একবারের জন্যও তাদের দেখা মেলেনি।
২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটের অভিজ্ঞ পাখি সংরক্ষক শামীম খানের আমন্ত্রণে ‘বার্ডিংবিডি টুরস’-এর সাথে কানাইঘাটের বড় হাওরে যাত্রা করা হয়। মূল লক্ষ্য ছিল অতিবিরল পাতিসারসের খোঁজ করা। অসংখ্য বিলের সমন্বয়ে গঠিত সেই হাওরের দৃশ্য ছিল মনোমুগ্ধকর। বিলগুলোতে হাঁসসহ নানা প্রজাতির জলচর পাখির আনাগোনা এবং মহিষ ও গরুর পালের বিচরণ এক অপূর্ব পরিবেশ তৈরি করেছিল। তবে আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা ছিল এবং একপর্যায়ে অন্ধকার নেমে আসে। শুরু হয় প্রবল বৃষ্টি, যার ফলে ক্যামেরা রক্ষা করতে জেলেদের ডেরায় আশ্রয় নিতে হয়। বৃষ্টি থামার পর সারস খোঁজার চেষ্টা করা হলেও মেঘলা আকাশের কারণে সারা দিনে তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। অথচ আগের দিন চমৎকার আবহাওয়ায় পাখি দুটি সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছিল। প্রায় ১৪ কিলোমিটার পথ হেঁটেও পাতিসারসের দেখা না পেয়ে হতাশার মধ্য দিয়েই রাতের বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়। এরপর থেকে ওই হাওরে আর পাতিসারস দেখা যায়নি।
তবে পাতিসারসের দেখা না মিললেও শামীম খানের সহায়তায় অন্তত তিন প্রজাতির পাখির ছবি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম ছিল সেই কালচে মুখের চড়ুইয়ের মতো দেখতে পাখিটি। শেষ বিকেলে বড় হাওর থেকে বেরিয়ে যখন পাকা রাস্তায় আসা হয়, ঠিক তখনই একটি সেতুর কাছে বিদ্যুতের তারের ওপর বঘেরি পাখিটিকে বসে থাকতে দেখা যায়। দ্রুত ক্যামেরার ক্লিক করে তার ছবি তোলা হয়। যদিও কুরমা বা টাঙ্গুয়ার মতো ছবিগুলো ততটা নিখুঁত হয়নি, তবুও এই প্রাপ্তি ছিল সন্তোষজনক।
প্রথমে টাঙ্গুয়ার হাওর, এরপর কুরমা এবং সবশেষে কানাইঘাটে দেখা যাওয়া এই পাখিটি হলো এ দেশের অত্যন্ত দুর্লভ পরিযায়ী পাখি বঘেরি। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘ব্ল্যাক-ফেসড বান্টিং’। এটি Emberizidae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম Emberiza melanocephala। সাইবেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল থেকে চীনের উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত এই পাখির বিস্তৃতি। শীতকালে তারা বাংলাদেশসহ উত্তর-পূর্ব ভারত, চীনের দক্ষিণাঞ্চল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উত্তরাঞ্চলের দেশগুলোতে পরিযায়ন করে।
বঘেরি দেখতে অনেকটা চড়ুই পাখির মতো। এদের দৈর্ঘ্য ১৩.৫ থেকে ১৬ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৩ থেকে ২৭ গ্রামের মধ্যে হয়ে থাকে। স্ত্রী ও পুরুষ পাখির পালকের রঙে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রজননকাল ব্যতীত অন্য সময়ে এদের দেহের রঙ, বিশেষ করে মাথার রঙ নিষ্প্রভ হয়ে যায়। অন্যদিকে স্ত্রী পাখির দেহের উপরের অংশ কালচে লম্বা দাগসহ ধূসর-বাদামি রঙের হয়।
শীতকালে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব, উত্তর, উত্তর-পশ্চিম এবং কেন্দ্রীয় অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। এরা সাধারণত একাকী, জোড়ায়, ছোট দলে অথবা অন্যান্য প্রজাতির বঘেরির মিশ্র দলে বিচরণ করে। জলাভূমির আশপাশের উঁচু ঘাসভূমি, ঝোপঝাড়, ধানখেত এবং বড় গাছের তলার লতাগুল্মপূর্ণ স্থানে এদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। লাজুক স্বভাবের এই পাখিগুলো সাধারণত ঝোপঝাড়ের আড়ালে থাকে এবং মাঝেমধ্যে খোলামেলা জায়গায় আসে। এদের প্রধান খাদ্য হলো ঘাসবিচি, শস্যদানা ও পোকামাকড়।
মে থেকে জুন মাস পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। এই সময়ে তারা তাদের মূল আবাসস্থল সাইবেরিয়া ও চীনের উত্তরাঞ্চলের মাটিতে অথবা নিচু ঝোপঝাড়ের গোড়ায় ঘাস দিয়ে ছোট কাপ আকৃতির বাসা তৈরি করে। বাসার গদি তৈরির জন্য তারা চুল ব্যবহার করে। স্ত্রী পাখি সাধারণত ৪-৫টি ফ্যাকাশে রঙের ডিম পাড়ে, যাতে বাদামি দাগ থাকে। ১২-১৪ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় এবং ছানারা মাত্র ৯-১৪ দিনের মধ্যেই উড়তে শেখে। বঘেরির গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ৪ বছর।
তথ্যগুলো প্রদান করেছেন পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ আ ন ম আমিনুর রহমান, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।