দেশের অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জে আলুর বাজারে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচের তুলনায় বর্তমান বাজারদর অনেক নিচে নেমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার হাজার হাজার আলুচাষি ও ব্যবসায়ী। গত দুই মৌসুমের ধারাবাহিকতায় এবারও বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন তারা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারে আগাম আলু উঠতে শুরু করবে, অথচ জেলার ৬১টি হিমাগারে এখনো প্রায় ২ লাখ ৬১ হাজার টন আলু মজুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, এই আলুগুলো বিক্রি করে যদি উৎপাদন ও সংরক্ষণ খরচ তোলা না যায়, তবে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মোট ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
আক্রান্ত কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৫০ কেজির এক বস্তা আলু উৎপাদন এবং তা হিমাগারে সংরক্ষণ করতে গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বর্তমানে হিমাগার থেকে প্রতি বস্তা আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। এর ফলে বস্তাপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের। হিমাগারের ভাড়া পরিশোধ করার পর অনেক কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ৫০ থেকে ২০০ টাকা, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়েও কম অর্থ পাচ্ছেন তারা।
কৃষকদের অভিযোগ, আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচের বড় অংশই উঠে আসছে না। জমি প্রস্তুত করা, বীজ সংগ্রহ, সার, কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ এবং শ্রমিকের মজুরি বাবদ যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তা তুলতে না পেরে অনেকেই এখন ঋণের বোঝায় জর্জরিত। আগের মৌসুমের লোকসান কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই নতুন মৌসুমের চাষাবাদ সামনে চলে আসায় তাদের দুশ্চিন্তা আরও বহুগুণ বেড়েছে।
মুন্সীগঞ্জের অন্যতম প্রধান আলু উৎপাদনকারী উপজেলা সিরাজদিখানে লোকসানের চিত্রটি আরও উদ্বেগজনক। উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এই উপজেলায় ৮ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়েছিল, যার ফলে ৩ লাখ ২ হাজার ৭৫ টন আলু উৎপাদিত হয়। বর্তমানে উপজেলার নয়টি হিমাগারে প্রায় ৭ লাখ ৮০ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। প্রতি বস্তায় ৭০০ টাকা লোকসান ধরে হিসাব করলে এসব আলুর সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৫ কোটি টাকা।
লতাব্দী ইউনিয়নের আলু ব্যবসায়ী মাহবুব হোসেন রন্টু জানান, গত মৌসুমে নাহার, নেপচুন ও সম্রাট—এই তিনটি হিমাগারে তিনি আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। এর মধ্যে কিছু আলু বিক্রি করলেও এখনো বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত অবস্থায় রয়েছে। বর্তমানে আলু বিক্রি করতে গেলে বস্তাপ্রতি প্রায় ৭০০ টাকা লোকসান হচ্ছে। সব মিলিয়ে এ বছর তার প্রায় ৫০ লাখ টাকা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, বয়রাগাদী ইউনিয়নের গোবরদী গ্রামের আলু ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, আলুর ব্যবসা করতে গিয়ে গত দুই বছরে তিনি প্রায় ৬০ লাখ টাকা লোকসানে পড়েছেন। এই লোকসান সামাল দিতে তাকে স্ত্রীর সাত ভরি স্বর্ণালংকার পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। ধারদেনা করে ব্যবসা শুরু করলেও এখন কীভাবে এই পরিস্থিতি সামাল দেবেন, তা বুঝতে পারছেন না তিনি।
একই উপজেলার দক্ষিণ তাজপুর গ্রামের আলুচাষি আব্দুল মান্নান জানান, এ বছর চারটি হিমাগারে তিনি ৭ হাজার ৫০০ বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন। বর্তমান বাজারদর অব্যাহত থাকলে তাঁর প্রায় ৬০ লাখ টাকা লোকসান হতে পারে।
আলুর দাম কমে যাওয়ায় শুধু কৃষক ও ব্যবসায়ী নন, লোকসানের শঙ্কায় রয়েছেন হিমাগারমালিকেরাও। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে হিমাগার থেকে আলু সরিয়ে নেওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে চাহিদা কম থাকায় অনেক ব্যবসায়ী আলু তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যদিকে নতুন আলুর মৌসুম ঘনিয়ে আসায় হিমাগার খালি করা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সিরাজদিখানের ফয়েজ কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক মো. শাহ আলম জানান, গত বছর তাদের হিমাগারে ১ লাখ ৫ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এখনো সেখানে প্রায় ৫৫ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হিমাগার খালি করার কথা থাকলেও বাজারে আলুর চাহিদা না থাকায় ব্যবসায়ীরা আলু নিতে চাইছেন না। এতে কৃষকের পাশাপাশি হিমাগার কর্তৃপক্ষও লোকসানের মুখে পড়তে পারে।
নাহার কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থাপক আরশাদ হোসেন বলেন, দাম দিন দিন কমে যাওয়ায় কৃষক ও হিমাগার দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তাদের হিমাগারে এখনো প্রায় ৬০ হাজার বস্তা আলু রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী মাসের মধ্যে ব্যবসায়ীদের এসব আলু সরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
হিমাগারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, অনেক সময় সংরক্ষণ ভাড়া তুলতে না পারলেও হিমাগার খালি করতে কম দামে আলু বিক্রি করে দিতে হয়। প্রতি বস্তা আলুর ভাড়া যেখানে প্রায় ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা, সেখানে বাজারে আলুর দাম ভাড়ার চেয়েও কমে গেলে হিমাগার কর্তৃপক্ষকেও লোকসান গুনতে হয়।
শ্রীনগর উপজেলাতেও আলুর বাজারে মন্দাভাব বিরাজ করছে। উপজেলার তিনটি হিমাগারের মধ্যে আল-আমিন ও সোন্দারদিয়া কোল্ড স্টোরেজে আলু বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। তবে আটপাড়া শ্রীনগর কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডে এখনো বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত রয়েছে।
হিমাগারটির লেবার লিডার আবুল হোসেন জানান, এর ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বস্তা। এখনো প্রায় ৭০ হাজার বস্তা আলু বিক্রি হয়নি। বাজারে চাহিদা কম থাকায় পাইকাররাও আগের মতো আসছেন না।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা জানান, হিমাগার থেকে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা আলু ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে হিমাগার ভাড়া বাবদ প্রায় ৩০০ টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে অন্যান্য উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার আগেই কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
শ্রীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় ১ হাজার ৯৪৪ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৫৮ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন।
উপজেলার কৃষকেরা জানান, গত দুই মৌসুমে উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। আগের লোকসান কাটিয়ে উঠতে না পেরে এবারও অনেককে কম দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। সামনে নতুন মৌসুমের চাষাবাদ শুরু হলেও বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য উপকরণের খরচ জোগাড় করা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
স্থানীয় কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কানি (১৪০ শতাংশ) জমিতে আলু চাষ করতে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার থেকে ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এ জমিতে গড়ে ৪০০ মণ আলু উৎপাদিত হলে প্রতি মণের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারদর উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম হওয়ায় লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।
আলুর বাজারে দীর্ঘদিনের এই সংকট মোকাবিলায় উৎপাদিত আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে কৃষি বিভাগ। মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মো. সামির হোসাইন সিয়াম জানান, আলুর লোকসান কমাতে এবং বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তাদের আলুর আচার, চাটনি ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে জেলায় আলুভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা গেলে উৎপাদিত আলুর ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।
সিরাজদিখান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে গত বছর উপজেলায় আলুর উৎপাদন বেশি হয়েছিল। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাননি। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় জাতের পরিবর্তে রপ্তানিযোগ্য জাতের আলু উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চলতি বছর এসব জাতের আলু উৎপাদনে আরও প্রদর্শনী কার্যক্রম নেওয়া হবে। পাশাপাশি আলুর সঙ্গে অন্যান্য লাভজনক ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে বিকল্প ফসলের মাধ্যমে তাদের লোকসানের ঝুঁকি কমানো যায়।
মুন্সীগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. হাবিবুর রহমান বলেন, দেশে উৎপাদিত বিপুল আলুর যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করতে হলে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সঙ্গে কৃষিকে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি আলু বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও কাজে লাগাতে হবে।