মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য কেনার সুযোগ করে দিতে সিলেটে বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে চালু করা হয়েছিল ‘কৃষকের হাট’। গত ১১ এপ্রিল নগরের টিলাগড় পয়েন্টে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর হাত ধরে এই হাটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, চালুর পর দীর্ঘ ছয় মাসে সেখানে মাত্র একদিন হাট বসেছে।

কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টিলাগড়ে প্রতিষ্ঠিত এই হাটটি প্রতি সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার বসার কথা ছিল। কিন্তু বর্ষা মৌসুমের শুরু এবং কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে কৃষকরা সেখানে উপস্থিত হননি। বর্তমানে কৃষকদের পুনরায় উৎসাহিত করতে হাটে নতুন করে শেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিলেট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) তত্ত্বাবধানে শেড বা স্থায়ী কাঠামো তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। টিন বসানোর কাজ সম্পন্ন হলে আগামী সপ্তাহখানেকের মধ্যে হাটটি পুনরায় চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কৃষকের হাট উদ্বোধনের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে সাধারণ মানুষ এখান থেকে সাশ্রয়ী মূল্যে টাটকা সবজি ও কৃষিপণ্য পাবেন। কিন্তু উদ্বোধনের পর মাত্র একদিন হাট বসার পর আর কৃষকদের দেখা মেলেনি এবং টাটকা সবজিও পাওয়া যায়নি।

টিলাগড় পয়েন্ট সংলগ্ন কালাশীল এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “টিলাগড় পয়েন্টে হাট বসার পর আমরা ভেবেছিলাম এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে টাটকা সবজি মিলবে। উদ্বোধনের পর নির্ধারিত দিনে কয়েকবার গিয়েও হাট বন্ধ পেয়েছি।”

টিলাগড় শাপলাবাগ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল হক আক্ষেপ করে বলেন, “কৃষকের হাট উদ্যোগটি অনেক ভালো ছিল। আমরা স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেছিলাম, সরাসরি কৃষকের হাত থেকে সবজি ও পণ্য কিনতে পারব। এখন মনে হচ্ছে, সব আইওয়াশ। দু-একদিন গিয়ে ফিরেও এসেছি।”

অন্যদিকে, স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হাসান মনে করেন, এই স্থানে কৃষকের হাট বসানোর সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল না। তিনি বলেন, “এই জায়গায় কৃষকের হাট বসানো ঠিক হয়নি। জায়গাটি চারমুখী সড়কের সংযোগস্থল হলেও আশপাশে খুব বেশি শাকসবজি উৎপাদন হয় না। কৃষি বিভাগ কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই ঢাকঢোল পিটিয়ে এখানে হাট স্থাপন করেছে। দূর-দূরান্ত থেকে কেউ এসে সবজি বিক্রি করতে গেলে পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। তখন বেশি দামে বিক্রি না করলে লোকসানের মুখে পড়তে হবে। তাই তারা এখানে আসবেন না।”

সিলেট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শওকত জামিল দাবি করেন, হাটটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়নি। বর্ষা মৌসুমে স্থানীয়ভাবে সবজি উৎপাদন কম হওয়া এবং বৃষ্টির কারণে কৃষকরা বাজারে আসতে অনীহা প্রকাশ করায় আর হাট বসেনি। পরবর্তীতে সদর উপজেলার ইউএনওর প্রচেষ্টায় হাটে শেড স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যার কাজ প্রায় শেষের পথে।

তিনি আরও বলেন, “বর্ষা মৌসুম শেষে এখন শাকসবজি উৎপাদন বেড়েছে। আমরা কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। বাজারে সবজির পাশাপাশি মাছ বিক্রিরও অনুমতি দেওয়া হবে। আশা করছি, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে হাটটি পুনরায় চালু হবে।”

সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ এই পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “কৃষকের হাটের মতো একটি জনহিতকর উদ্যোগ শুরু হতেই থমকে যাওয়া হতাশাজনক। কৃষি বিভাগের উচিত ছিল কৃষকদের নিয়মিত যাতায়াত ও পণ্য আনার বিষয়টি নিশ্চিত করা। কোনো ধরনের পরিকল্পনা ও পরিস্থিতি যাচাই না করে এমন উদ্যোগ গ্রহণ ঠিক হয়নি।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. শামসুজ্জামান জানান, স্থায়ী কাঠামো তৈরি করে হাটটি পুনরায় চালু করা হবে। উপজেলা প্রশাসন বর্তমানে শেড স্থাপনের কাজ করছে। এই কাজ শেষ হলে প্রজেক্টটি চালু করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।