দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে এক হাজার কোটি টাকার ‘গ্রিন বন্ড’ ইস্যু করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। এ বন্ডের অর্থ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব খাতে ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রিন বন্ড নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন এই বন্ড চালু করেছে ব্র্যাক ব্যাংক।
কোনো গ্রাহক ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ড কিনলে প্রথমে ক্রয়মূল্য হবে ৮ লাখ ৪ হাজার ৯৬১ টাকা। তিন বছর মেয়াদপূর্তিতে মুনাফার পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯ টাকা।
আজ রোববার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তারেক রেফাত উল্লাহ খান, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) ও হেড অব হোলসেল ব্যাংকিং মো. শাহীন ইকবাল, হেড অব স্ট্রাকচারাল ফাইন্যান্স তানভীর কামালসহ ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘এই গ্রিন বন্ডের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের জন্য মূলধন সংগ্রহ করা হবে। এই বন্ডের অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবেশবান্ধব ভবন ও শিল্পকারখানায় জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগে অর্থায়নে সহায়তা করতে চাই।’
সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে গ্রিন বন্ড নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন ব্র্যাক ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও হেড অব হোলসেল ব্যাংকিং মো. শাহীন ইকবাল। তিনি জানান, ব্র্যাক ব্যাংক গ্রিন বন্ডের মেয়াদ তিন বছর। এটি একটি আনসিকিউরড (জামানতহীন), আনকনভার্টেবল (শেয়ারে রূপান্তরযোগ্য নয়), সম্পূর্ণ পরিশোধযোগ্য ও জিরো–কুপন বন্ড (নির্দিষ্ট মেয়াদি কোনো সুদ বা কুপন নেই)। দেশের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ করা এই বন্ডের মূল লক্ষ্য। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যে কেউ এই বন্ড কিনতে পারবেন।
মো. শাহীন ইকবাল জানান, বন্ডটির অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা। অর্থাৎ কেউ এতে বিনিয়োগ করতে চাইলে ন্যূনতম ১০ লাখ টাকার বন্ড কিনতে হবে। তিন বছর মেয়াদি এই বন্ডের ক্ষেত্রে ডিসকাউন্ট রেট ধরা হয়েছে সাড়ে ৭ শতাংশ।
বিষয়টি একটু সহজ করে বলা যাক, কোনো গ্রাহক ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ড কিনলে প্রথমে ক্রয়মূল্য হবে ৮ লাখ ৪ হাজার ৯৬১ টাকা। তিন বছর মেয়াদপূর্তিতে ব্যাংক থেকে ওই গ্রাহককে ১০ লাখ টাকা পরিশোধ করা হবে। তাতে মুনাফার পরিমাণ হয় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৯ টাকা। এই ১০ লাখ টাকাকে বন্ডটির অভিহিত মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এই বন্ড থেকে সংগ্রহ করা টাকা বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে ব্যবহার করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত, পরিবেশবান্ধব ভবন, শিল্প খাতে জ্বালানির দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রভৃতি।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই বন্ডের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো কর অব্যাহতির সুবিধা। যেহেতু এটি জিরো–কুপন বন্ড, তাই আয়কর আইন অনুযায়ী এই বন্ড থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর কোনো অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বা অন্যান্য কর প্রযোজ্য হবে না। এ ছাড়া বন্ডটিতে বিনিয়োগের আবেদনের সময় শেষ হওয়ার পরে তা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে। তালিকাভুক্তির পর নিয়মানুযায়ী বিনিয়োগকারীরা এতে কর রেয়াতও ভোগ করতে পারবেন। আবার যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বিনিয়োগকারী মেয়াদের আগেই বাজার থেকে বন্ড বিক্রি করে সহজেই নগদ টাকা তুলতে পারবেন।
ব্র্যাক ব্যাংক জানায়, এ বন্ডে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি থেকে সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারী এবং বিভিন্ন কোম্পানির প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটি ফান্ড থেকে এই গ্রিন বন্ডে বিনিয়োগ করা যাবে। এতে সাধারণ সঞ্চয়পত্রের মতো বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা রাখা হয়নি।
বিনিয়োগকারীরা সময়সীমার মধ্যে প্রতি সপ্তাহের বুধবার এই বন্ডে আবেদনের সুযোগ পাবেন। ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে এই আবেদন করা যাবে। তবে নির্ধারিত বুধবার সরকারি বা ব্যাংক ছুটি থাকলে ঠিক তার আগের কর্মদিবসে আবেদন জমা নেওয়া হবে। বন্ডটিতে আবেদনের জন্য বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক। গ্রাহকদের সুবিধার জন্য ব্র্যাক ব্যাংক শাখাগুলোয় সহজে বিও অ্যাকাউন্ট খোলার ব্যবস্থা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সুদহার কত হবে—এ প্রশ্নের জবাবে ব্র্যাক ব্যাংকের হেড অব হোলসেল ব্যাংকিং মো. শাহীন ইকবাল বলেন, ‘আমরা সাড়ে ৭ শতাংশ হারে যে টাকাটা নিয়েছি, তা ৯ শতাংশ হারে বিনিয়োগ করব। প্রকৃত অর্থে এই বন্ড ইস্যু করার পরে এটার যেসব খরচ আছে, সেগুলো দিয়ে এত কম হারে ঋণ দিতে পারি না। কিন্তু আমরা চেষ্টা করেছি ব্যাংকের কোনো মার্জিন ছাড়াই যেন এই ঋণ দেওয়া যায়। এ জন্য আমরা সিঙ্গেল ডিজিটে এই বন্ড থেকে ঋণ দেব; যাতে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগগুলো উপকৃত হতে পারে।’
গ্রিন বন্ডের ঋণের টাকা পরিবেশবান্ধব খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে জানতে চান এক সাংবাদিক। জবাবে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘বর্তমানে অনেক কারখানায় জ্বালানি উৎসের ১৫–২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে জ্বালানি খরচ কমে আসে। সুতরাং আমরা মনে করি, উদ্যোক্তারা গ্রিন বন্ড থেকে ঋণ নিতে আরও উদ্বুদ্ধ হবেন। আর এই অর্থ ঠিকভাবে পরিবেশবান্ধব খাতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকিতে করা হবে।’
ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রিন বন্ডের অভিহিত মূল্য ১০ লাখ টাকা। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কথা চিন্তা করে তা আরও কমানো যেত কি না, তা জানতে চান আরেকজন সাংবাদিক। জবাবে ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য এই মুহূর্তে বিনিয়োগের সুযোগ নেই। তবে যখন বন্ডটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হবে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা খুব অল্প পরিমাণে বিনিয়োগ করতে পারবেন।
সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরের চেয়ে এখানে মুনাফা বা সুবিধা কম রয়েছে, এতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী হবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তারেক রেফাত উল্লাহ খান বলেন, সঞ্চয়পত্র বা এফডিআরে মুনাফা বেশি হলেও যাঁরা উচ্চ সম্পদশালী ব্যক্তি, তাঁরা সাধারণত ৩০ শতাংশ করজালের অন্তর্ভুক্ত। এফডিআরের মুনাফা থেকে শুরুতেই ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। পরে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়ে সামগ্রিকভাবে পুরো ৩০ শতাংশ করই দিতে হয়। অন্যদিকে এই গ্রিন বন্ডের মূল বড় সুবিধাটি হলো এখানে বিনিয়োগ করলে কোনো অতিরিক্ত কর দিতে হবে না।