দেশের শীর্ষ ঘরোয়া ফুটবল প্রতিযোগিতার ম্যাচগুলো আয়োজন করা হলেও মানিকগঞ্জের শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়ামে প্রকট হয়ে উঠছে অব্যবস্থাপনা। অপরিকল্পিত গোলপোস্টের গঠন, নোংরা ও আগাছায় ছেয়ে যাওয়া গ্যালারি এবং মাঠের বেহাল দশা খেলোয়াড়দের ইনজুরির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি এসব কারণে গ্যালারিতে দেখা যাচ্ছে তীব্র দর্শকশূন্যতা।
বাংলাদেশ ফুটবল লিগ (বিএফএল) এবং ফেডারেশন কাপের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ টুর্নামেন্টের ভেন্যু হওয়া সত্ত্বেও খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা, দর্শকদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং মাঠের সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড়, কোচ ও ফুটবলপ্রেমীরা।
গোলপোস্টের ত্রুটিতে ইনজুরির শঙ্কা
গত ২০ অক্টোবর ফেডারেশন কাপের একটি ম্যাচের আগে স্টেডিয়ামের গোলপোস্ট পরীক্ষা করতে গিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন সিটি ক্লাবের গোলরক্ষক কোচ নুরুজ্জামান নয়ন। তার দাবি, আন্তর্জাতিক মানের গোলপোস্টের তুলনায় এখানে গোলবারের পেছনে নিরাপদ দূরত্ব অনেক কম। এর ফলে বল ঠেকাতে বা ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ধরতে গিয়ে গোলরক্ষকরা গুরুতর আঘাত পেতে পারেন।
নুরুজ্জামান নয়ন বলেন, “এখানে যেটা দেওয়া আছে, এটা ভেরি ক্লোজ টু গোল লাইন। মানে আমার কাছে মনে হয়, ইট শুড বি ডাবল। অ্যাটলিস্ট ডাবল যদি হয়, তাহলে ইনজুরির প্রবণতা অনেক কমে যাবে।”
গোলপোস্টের কাঠামোগত সমস্যা এবং তা সমাধানের উপায় নিয়ে ভেন্যুর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মোশাররফ বাদলের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেন তিনি। তবে শীর্ষ পর্যায়ের ম্যাচ আয়োজনের আগে কেন এই ঝুঁকি দূর করা হয়নি, সেই প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
মানিকগঞ্জ তপন স্টেডিয়ামের ভেন্যু তত্ত্বাবধায়ক মোশাররফ বাদল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গোল বারের ওপরেরটা কিন্তু এখন স্ট্রেইটই থাকে, আগে ছিল কার্ভ, এখন কিন্তু সেটা নাই। হ্যাঁ, ওইটা কারেক্ট, ঠিকই আছে। আর এই রডটা একটু ক্লোজ হয়ে গেছে।”
সমস্যার কারণ হিসেবে ব্যবস্থাপনা ও অর্থের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, “একটু প্রবলেম হয়ে গেছে আমাদের। এখানে যেহেতু কমিটি নাই, আমি আমার ছোট ভাই আর অন্য ছেলেপুলেদের দিয়ে কাজ করাচ্ছি। এটা ফান্ডের ব্যাপার আছে একটা।”
তবে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অর্থ ও জনবলের সীমাবদ্ধতার যুক্তি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাঠের বিভিন্ন জায়গায় ঘাস উঠে যাওয়া এবং গোলবারের কাছে শক্ত ও শুকনো মাটি পড়ে থাকায় খেলোয়াড়দের ইনজুরির ঝুঁকি আরও প্রবল হচ্ছে।
নোংরা গ্যালারি ও দর্শকশূন্যতা
স্টেডিয়ামের দর্শক গ্যালারির অবস্থাও অত্যন্ত হতাশাজনক। সরেজমিনে দেখা গেছে, বসার স্থানগুলো নোংরা এবং বিভিন্ন জায়গায় ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। কোথাও কোথাও লতাপাতায় ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। গ্যালারির একটি বড় অংশ দর্শকদের বসার উপযোগী নয়। কিছু দর্শক বসে খেলা দেখলেও সামগ্রিক পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণের চরম ঘাটতি চোখে পড়ে।
ফুটবলপ্রেমীদের প্রশ্ন, যে স্টেডিয়ামে দর্শকদের বসার জায়গাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হয় না, সেখানে দর্শক টানার উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে? স্থানীয় মাঠে সাধারণ ফুটবল ম্যাচেও দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। অথচ মানিকগঞ্জে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর খেলা হওয়া সত্ত্বেও গ্যালারিতে দর্শকের উপস্থিতি খুবই নগণ্য।
ফাহিমুল হাসান নামে এক দর্শক বলেন, “ফুটবল আমাদের প্রাণের খেলা। গ্রামের কোনো মাঠে খেলা হলে দর্শকদের জায়গা দিতে আয়োজকদের হিমশিম খেতে হয়। সেখানে মানিকগঞ্জে বড় বড় দলের খেলা হচ্ছে, বাংলাদেশ ফুটবল লিগ ও ফেডারেশন কাপের মতো প্রতিযোগিতা হচ্ছে। অথচ গ্যালারিতে দর্শক নেই বললেই চলে। গ্যালারি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও বসার উপযোগী থাকলে দর্শকেরা পরিবার নিয়ে খেলা দেখতে আসতে পারতেন।”
আরেক দর্শক আনোয়ার হোসেন হান্নান বলেন, “স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসার পরিবেশ নেই। জায়গায় জায়গায় ময়লা-আবর্জনা, লতাপাতা জমে আছে। দর্শক এসে কোথায় বসবেন? শুধু মাঠে খেলা আয়োজন করলেই তো হবে না, দর্শকদের সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। এসব সমস্যা সমাধান করা হলে মানুষ মাঠে এসে খেলা দেখতে আগ্রহী হবেন।”
আয়োজন থাকলেও নেই যথাযথ ব্যবস্থাপনা
গত বছর থেকে শহীদ মিরাজ-তপন স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ফুটবল লিগের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। চলতি মৌসুমে লিগের পাশাপাশি এখানে ফেডারেশন কাপের ম্যাচগুলোও আয়োজন করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২৪ অক্টোবর এই ভেন্যুতে বাংলাদেশ ফুটবল লিগের পঞ্চম রাউন্ডের ম্যাচে মুখোমুখি হয় পিডব্লিউডি স্পোর্টস ক্লাব ও বাংলাদেশ পুলিশ এফসি।
খেলা শুরুর দুই ঘণ্টা আগেও মাঠে অবাধে প্রবেশ এবং ছবি তোলার জন্য ভিড় দেখা যায়, যা মাঠের অবস্থাকে আরও খারাপ করার আশঙ্কা তৈরি করে। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে মাঠের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা এবং খেলার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে বাফুফের গ্রাউন্ডস কমিটির প্রধান ইকবাল হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “২৫ তারিখের পর হয়ত একটা লম্বা বিরতি হবে। এই বিরতির মধ্যে আমরা সব মাঠগুলোকে আরও ডেভেলপমেন্ট করার চেষ্টা করব।”
সূচি অনুযায়ী, দীর্ঘ বিরতির পর আগামী ২৪ নভেম্বর এই মাঠে ফেডারেশন কাপের একটি ম্যাচ এবং ৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ফুটবল লিগের আরেকটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই বিরতির মধ্যে মাঠের ঘাস মেরামত, গোলপোস্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গ্যালারির পরিচ্ছন্নতা এবং দর্শকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুনা আরা সুলতানা মুক্তকণ্ঠকে জানান, শিগগিরই স্টেডিয়ামের বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করা হবে।