আমাদের বন ও পাহাড়ের এক অনন্য ও সুদর্শন বৃক্ষ চালমুগরা বা ডালমুগরি বর্তমানে মহাবিপন্ন হয়ে পড়েছে। ২০১৪ সালে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রথম এই গাছটি দেখার সুযোগ হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে খাগড়াছড়ির আলুটিলা ডাউনের বটগাছ দেখতে যাওয়ার সময় প্রাকৃতিক আবাসে পুনরায় গাছটি দেখা যায়। তবে সে সময় গাছটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায়নি এবং এটি যে এতটা বিপন্ন হয়ে পড়েছে, তা উপলব্ধি করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম এবং আইইউসিএন প্রকাশিত রেড লিস্টে এই গাছটিকে মহাবিপন্ন উদ্ভিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রেড লিস্টে বর্ণিত মহাবিপন্নতার তথ্যগুলো দেখার পর পুনরায় এই বৃক্ষটির কথা মনে পড়ে। মূলত বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারের নির্দিষ্ট কিছু বনাঞ্চলে এই গাছটি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মাত্র ১০টি স্থানে প্রাকৃতিক আবাসে এই গাছের অস্তিত্ব থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২২ সালে পরিচালিত সর্বশেষ জরিপের তথ্যানুসারে, প্রতিটি স্থানে মাত্র ১ থেকে ৩টি পূর্ণাঙ্গ উদ্ভিদ দেখা গেছে এবং বর্তমানে সেগুলো চরম হুমকির মুখে রয়েছে। উল্লিখিত স্থানগুলোর উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, প্রাকৃতিক আবাসে মোট উদ্ভিদের সংখ্যা ১০০-এরও কম। গড়ে প্রতিটি স্থানে এই সংখ্যা ৫-এর নিচে, যা ‘অত্যন্ত বিপন্ন’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নির্ধারিত সূচকের চেয়েও অনেক কম। এই গাছটির দ্রুত বিলুপ্তির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে বীজের অত্যধিক আহরণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ, এই বীজের তেল কুষ্ঠ ও অন্যান্য চর্মরোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকর। এছাড়া চালমুগরার প্রাকৃতিক বংশবৃদ্ধির হারও অত্যন্ত কম বলে পরিলক্ষিত হয়েছে।
স্থানীয় পরিসরে এই গাছটি বান্দরবানের পলি ও রেমাক্রি প্রাংসা; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, হাজারীখিল, বারোইয়াধলা ও ধোপাছড়ি; কক্সবাজারের ভোমারিঘোনা; খাগড়াছড়ির আলুটিলার নিকটবর্তী এলাকায়; রাঙামাটির রামপাহাড়, দামাইছড়ি, ফারুয়া, কাসালং-মাসালং, পাবলাখালী এবং মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া ও শ্রীমঙ্গলে দেখা যায়। তবে আশার কথা এই যে, সম্প্রতি কয়েকটি স্থানে এই গাছ রোপণ করা হয়েছে।
চালমুগরা (Hydnocarpus kurzii) একটি চিরসবুজ মাঝারি আকারের বৃক্ষ। এই গাছটি উচ্চতায় ১২ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। এর কাণ্ড সরল, গোলাকার ও সোজা। বাকল মসৃণ ও পুরু এবং এর রং সবুজাভ ধূসর। পাতাগুলো পুরু, ভল্লাকার বা আয়ত ভল্লাকার এবং আগা সুচালো। পাতার কিনারা সমান হলেও দুই পাশ ঢেউখেলানো। পাতার রং গাঢ় সবুজ এবং শিরাগুলো স্পষ্ট। হালকা হলুদ রঙের সুগন্ধি ফুলগুলো কখনো এককভাবে, আবার কখনো থোকায় থোকায় ফোটে। গ্রীষ্মকাল থেকে বর্ষাকাল পর্যন্ত ফুল ফোটার সময় থাকে। হেমন্তকালে ফল পরিপক্ব হয়। ফল গোলাকার এবং পাকা ফল শক্ত, পুরু ও বাদামি রঙের হয়। ফলের ভেতরে কয়েকটি বীজ থাকে।
বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রাকৃতিক উৎস থেকে গাছ সংগ্রহ করা হলেও, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকা এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দক্ষিণ আমেরিকার মতো অঞ্চলেও এই গাছের চাষাবাদ করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতে গত ১০ বছরে এই প্রজাতির সংখ্যা ৫০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এটি মূলত আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলের বৃক্ষ, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৮০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে পারে। যেখানে দিনের তাপমাত্রা ২৮ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে এবং বছরে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, সেখানে এই গাছ ভালোভাবে জন্মে ও বেড়ে উঠতে পারে। এটি পূর্ণ সূর্যালোক এবং হালকা ছায়াযুক্ত স্থান পছন্দ করে। প্রায় সব ধরনের মাটিতেই এটি জন্মাতে পারে; তবে সুনিষ্কাশিত বেলে-পলিযুক্ত সমতল ভূমি অথবা আর্দ্র কিন্তু সুনিষ্কাশিত পরিবেশেও এর ভালো বৃদ্ধি ঘটে।
চালমুগরা মহাবিপন্ন উদ্ভিদ হলেও এর ঔষধি গুণ চমৎকার। এই গাছ বিচিত্র রোগের মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। শরীরের কোথাও চুলকানি বা চুলকানির কারণে শরীর লাল হয়ে ফুলে গেলে চালমুগরার তেল চুলকানির স্থানে ভালোভাবে লাগিয়ে দিলে দ্রুত ভালো ফল পাওয়া যাবে। আমাশয় নিরাময়ে চালমুগরার পাতা পানিতে সেদ্ধ করে পানিটা ছেঁকে গরম করে পান করলে উপকার পাওয়া যায়। কুষ্ঠরোগে চালমুগরার বীজতেল গরম করে সকাল–বিকেল খেলে উপশম হয়। চুলে খুশকি হলে চালমুগরার তেল মাথায় লাগিয়ে এ অবস্থায় আধা ঘণ্টা রেখে দিতে হবে। তারপর মাথা ভালো করে ধুয়ে নিতে হবে। তাহলে খুশকি কমে যাবে। চর্মরোগে চালমুগরার পাতা বেটে নিয়ে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে চর্মরোগ ভালো হয়ে যায়। ডায়াবেটিসের প্রথম অবস্থায় চালমুগরার ১ গ্রাম বীজগুঁড়া প্রতিদিন সকাল–বিকেল গরম পানিসহ খেলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। চালমুগরার তেল গরম করে তাতে মৌচাকের মোম মিশিয়ে মলম তৈরি করে খোসপাঁচড়া ও সাধারণ ঘায়ে লাগালে সেরে যায়। চীন ও আর্জেন্টিনায় চালমুগরা তেল ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
— মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক