কন্নড় চলচ্চিত্র ‘প্রেমাদা উরাল্লি’র সাফল্যের কাহিনী যেন কোনো সিনেমার গল্পের চেয়ে কম কিছু নয়। মাত্র আড়াই থেকে তিন কোটি টাকার বাজেটে নির্মিত এই ছবিটি বক্স অফিসে আয় করেছে প্রায় ১১০ কোটি টাকা। তবে এই অভাবনীয় সাফল্যের পথটি ছিল অত্যন্ত বন্ধুর। এক সময় এই ছবিটি মুক্তি দেওয়ার জন্য নির্মাতাদের প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছিল। কেউ বিনিয়োগ করতে রাজি হননি, এমনকি মুক্তির দিনও শেষ মুহূর্তে কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনী বাতিল করা হয়েছিল। অথচ সেই ছবিটিই এখন কন্নড় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় ব্যবসায়িক চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্মাতাদের দাবি, যে প্রযোজকেরা একসময় ছবিটি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরাই এখন পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

সিনেমাটির এই অবিশ্বাস্য যাত্রার কথা সম্প্রতি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী স্ক্রিন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত এস কে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এক প্রভাবশালী প্রযোজককে আগেই সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ছবিটি ফিরিয়ে দিলে একদিন অনুতাপ করতে হবে।” মুক্তির পর ছবিটি ব্যাপক আলোচনায় আসতেই সেই প্রযোজক রাজকান্তকে ফোন করেন এবং পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ জানান। রাজকান্তের দাবি, একসময় যাঁরা এই ছবিতে অর্থ লগ্নি করতে আগ্রহী ছিলেন না, তাঁদের অনেকেই এখন নিজেদের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত।

তবে ‘প্রেমাদা উরাল্লি’র এই জয় কেবল বক্স অফিসের অঙ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পাঁচ বছর ধরে কাজের সুযোগ না পাওয়া এক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী পরিচালকের প্রত্যাবর্তন, চরম অর্থসংকটে প্রায় থমকে যাওয়া একটি সিনেমার মুক্তি এবং প্রচারের জন্য নির্মাতাদের নেওয়া অভিনব উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ছবিটি এখন কন্নড় চলচ্চিত্র অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।

ছবিটির পরিচালক মনোজ কুমারের জীবনও ছিল নাটকীয়তায় ভরপুর। তাঁর প্রথম ছবি ‘অক্ষি’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জয় করলেও, সেই স্বীকৃতির পর দীর্ঘ পাঁচ বছর তিনি কোনো নতুন কাজ পাননি। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন এই ছবিটি নির্মাণ করতে গিয়ে তাঁকে চরম আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে পড়েছিল যে, একপর্যায়ে শুটিং শেষ করার টাকা জোগাড় করতে তিনি নিজের মায়ের মঙ্গলসূত্র বন্ধক রাখার কথা পর্যন্ত ভাবতে বাধ্য হন।

নির্মাণ শুরুর দিকে ছবিটির বাজেট ছিল মাত্র এক কোটি টাকা। তবে শুটিং ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বাড়তে থাকায় পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয় পরিচালককে। কেউ ১০ লাখ, আবার কেউ ২০ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন। রাজকান্ত জানিয়েছেন, শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন বিনিয়োগকারী এই ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হন।

বাজেট সীমিত হলেও নির্মাণের মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করতে চাননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত নিজের পরিচিতির সুযোগ নিয়ে ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাড়ায় বিশেষ ছাড় আদায় করেন। যে সরঞ্জাম ভাড়া করতে দিনে ৩০ হাজার টাকা লাগত, তা তিনি ১৫ হাজার টাকায় পান। এছাড়া শতাধিক সদস্যের শুটিং দলকে আলাদা হোটেলে না রেখে ভাড়া করা একটি অনুষ্ঠানস্থলে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যদিও অভিনেতাদের জন্য আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা ছিল।

সিনেমাটি নির্মাণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় এর মুক্তি ও প্রচার। বড় কোনো তারকা না থাকায় প্রযোজকদের আগ্রহ ছিল খুবই কম এবং প্রচারণার জন্য হাতে পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। তখন পরিচালক মনোজ কুমার বেছে নেন এক ব্যতিক্রমী কৌশল। দর্শকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে কার্ড ছাপানো হয়। বাস, ট্রেন, বাসস্ট্যান্ড, মন্দির এবং জনসমাগমের বিভিন্ন স্থানে মানুষের হাতে সেই কার্ড তুলে দেন নির্মাতারা। তাঁদের অনুরোধ ছিল, অন্তত একবার যেন দর্শকেরা ছবিটি দেখেন।

পাশাপাশি কর্ণাটকের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার পেছনে আলোকপ্রতিফলক স্টিকার লাগানো হয়। রাজকান্ত জানান, ১০ হাজারের বেশি স্টিকার ছাপিয়ে প্রচার চালানো হয়েছিল। প্রচারের এই অনন্য পদ্ধতিটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছবিটির একটি ব্যক্তিগত ও আবেগীয় যোগাযোগ তৈরি করতে সাহায্য করে।

২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘প্রেমাদা উরাল্লি’। প্রথম দিন মাত্র ৬০টি প্রদর্শনী থেকে ছবিটি প্রায় ১২ লাখ টাকা আয় করে, যা ছিল বেশ হতাশাজনক। কিন্তু দ্বিতীয় দিন থেকেই দর্শকদের আগ্রহ বাড়তে থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা এবং মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ায় দ্রুত বাড়তে থাকে প্রদর্শনীর সংখ্যা।

বক্স অফিসের হিসাব নিয়ে কাজ করা স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তির দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই ছবিটির দৈনিক আয় কয়েক কোটি রুপিতে পৌঁছে যায় এবং তৃতীয় সপ্তাহেও সেই গতি বজায় থাকে। সিনেমা এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, মুক্তির মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে ছবিটির আয় ৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরবর্তীতে তা ১১০ কোটি টাকার বৈশ্বিক আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে।

তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বক্স অফিস হিসাবে কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। স্যাকনিল্কের ২৪ অক্টোবরের হালনাগাদ তথ্যে ছবিটির বিশ্বব্যাপী আয় ১১৫ কোটি টাকার বেশি দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১১০ কোটি টাকার বেশি আয়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান প্রাথমিক অনুমানের ওপর ভিত্তি করে হতে পারে, তাই নির্মাতাদের আনুষ্ঠানিক হিসাবের সঙ্গে কিছুটা পার্থক্য থাকা অসম্ভব নয়।

গল্পের কথা বললে, ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ মূলত গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের একটি কাহিনী। ছবিতে নাগান্নার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রঙ্গায়ন রঘু। ছেলেকে নিয়ে গ্রামে তাঁর সংসার। ছেলের জন্য একজন শিক্ষিত পুত্রবধূ খুঁজতে গিয়ে পরিবারে তৈরি হয় নানা জটিলতা। ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রী রাম। এছাড়া আরও অভিনয় করেছেন রামিকা শিবু ও তাপস্বিনী পুনাচ্চা।

ছবিটির গল্পে প্রেমের পাশাপাশি কৃষিজীবন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কর্ণাটকের হাসান অঞ্চলের সবুজ প্রকৃতি ছবিটির দৃশ্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত জানিয়েছেন, বর্ষার আবহকে ছবির আবেগের অংশ হিসেবে তারা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

‘প্রেমাদা উরাল্লি’র সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বড় তারকা কিংবা বিপুল প্রচার-ব্যয় ছাড়াই এই বিশাল সাফল্য অর্জন। শুরুতে মাত্র ৬০টি প্রদর্শনী পাওয়া একটি ছবি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শত শত প্রদর্শনীতে পৌঁছে যায়। দর্শকদের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়াই প্রেক্ষাগৃহ মালিক ও পরিবেশকদের আগ্রহ বাড়াতে সাহায্য করেছে। একসময় যে ছবির মুক্তি নিশ্চিত করা ছিল প্রায় অসম্ভব, সেটিই এখন প্রযোজকদের আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।