খুলনা মহানগর ও জেলা এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, প্রকাশ্য গুলি, চাঁদাবাজি এবং ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জননিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘাতের পাশাপাশি এখন পুলিশ সদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তারাও হামলার শিকার হচ্ছেন। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে খুলনা মহানগরী ও জেলায় মোট ৬৮টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে।
সম্প্রতি পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের খুলনা সফর চলাকালীন শনিবার তেরখাদায় এক যুবদল নেতা গুলিতে আহত হয়েছেন। অপরাধ দমনে রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও তেরখাদা উপজেলায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে ধারাবাহিক সহিংসতা এবং অপরাধী চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের পারহাজী গ্রামে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন রামিম বিশ্বাস (৩২), যিনি ওই গ্রামের হাবিবুর বিশ্বাসের ছেলে। স্থানীয় বিএনপি নেতা মোহাম্মদ বিল্লাল মোল্লার ভাষ্য অনুযায়ী, রামিম মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভ্যানে করে কোলা বাজারে যাওয়ার পথে পারহাজী গ্রামের প্রধান সড়কে পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা রামিমকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে তার পিঠের ডান পাশে গুলি লাগে। স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান, যেখানে সার্জারি ওয়ার্ডে তার চিকিৎসা চলছিল। তেরখাদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহম্মেদ আলী বিশ্বাস ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে।”
আইজিপির খুলনা সফর উপলক্ষে বিভাগের ১০ জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তা, প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি ও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আইজিপি জানান, এসব অপরাধ নির্মূলে সরকারের শূন্য সহনশীলতার নীতি রয়েছে। অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর পাশাপাশি কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অপরাধীরা গ্রেপ্তারের পর জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি নিয়েও কাজ চলছে বলে জানান আইজিপি। অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সমাজে চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে প্রভাবশালী বা ক্ষমাসংশ্লিষ্ট হওয়ায় সাধারণ মানুষ তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে ভয় পান।”
সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে আইজিপির এই সফর ঘিরে অপরাধ দমনে পুলিশের পদক্ষেপের দিকে নজর রয়েছে সবার। গত ২২ অক্টোবর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে খুলনা নগরীতে গুলিতে নিহত হন তাওহিদুল ইসলাম তুষার (৩২) ও খুশি বেগম (২৪)। ভোরে পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় তুষার এবং সন্ধ্যায় লবণচরা থানার জিন্নাহপাড়া বউবাজার এলাকায় খুশি নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির সামনে মায়ের উপস্থিতিতেই খুশি বেগমকে গুলি করার পাশাপাশি ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে দুর্বৃত্তরা। তার স্বামী সুমন সরদার এলাকায় ‘ব্লেড বাবু’ নামে পরিচিত। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মাদকসংক্রান্ত বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে।
নগরীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে সোনাডাঙ্গার দারুল আমান মহল্লায় একই পরিবারের তিনজনকে হত্যার ঘটনা। গত ৩০ মে একটি ভাড়া বাসা থেকে বেবি বেগম (৫৫) এবং তার দুই নাতি শামীম ব্যাপারী (১৩) ও মুস্তাকিমের (৪) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
জেলার রূপসা উপজেলাতেও ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ৫ অক্টোবর আইচগাতী ইউনিয়নের দুর্জনীমহলে গুলিতে নিহত হন আক্তার ঢালী। এর আগে ১৫ আগস্ট একই এলাকায় তার ছেলে জয় ঢালীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকায় অস্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে।
হত্যাকাণ্ডের বাইরেও গত কয়েক সপ্তাহে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত ৯ অক্টোবর রাতে অভিযান শেষে নগরীতে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। দুর্বৃত্তরা তার কাছ থেকে নগদ টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। এ সময় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার দুই হাতে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত শাহ আলমকে প্রথমে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গত ১২ অক্টোবর লবণচরার টুটপাড়ায় চাঁদা না পেয়ে একটি বাড়িতে হামলা ও ফাঁকা গুলি ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। ৭ অক্টোবর দৌলতপুরে সরকারি বিএল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম। ১৭ অক্টোবর রাতে পশ্চিম টুটপাড়ার আমতলা মোড়ে এক যুবককে গুলি করে তার মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। একই মাসের ১২ তারিখ সোনাডাঙ্গায় এক গৃহকর্ত্রীকে অচেতন করে সাড়ে পাঁচ ভরির বেশি স্বর্ণালংকার লুটের ঘটনাও ঘটে।
গত ৭ অক্টোবর দৌলতপুরের মহেশ্বরপাশায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল সন্ত্রাস, মাদক ও অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। এরপর খুলনা সদর সাবরেজিস্ট্রি অফিস থেকে সাবরেজিস্ট্রার তন্ময় কুমার মণ্ডলকে জোর করে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। প্রায় ৪০ মিনিট পর তিনি নিজ দপ্তরে ফিরে আসেন। ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা হলেও সাংবাদিকদের কাছে তিনি বলেন, “এমনি কথা ছিল, তাই গিয়েছিলাম।” এ ঘটনায় তার পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
জেলা পুলিশের ৭ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে জেলায় ৩৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন করা হলেও ১০টি তখনো অনুদ্ঘাটিত ছিল। পুলিশের হিসাবে, রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা এই চার উপজেলায় ২০টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে রূপসায় ১১টি, দিঘলিয়ায় চারটি, বটিয়াঘাটায় তিনটি ও তেরখাদায় দুটি। এসব এলাকায় মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ। মাদক কারবারিদের মধ্যে লাভের ভাগাভাগি ও স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকেও হত্যাকাণ্ড ঘটছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। মাদক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রূপসা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাবেদ হোসেন বলেন, সামান্য ঘটনাতেই খুনোখুনি বাড়ছে। তার অভিযোগ, রূপসা এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং পুলিশের ওপর তাঁদের আস্থা কমছে। ব্যবসায়ী নেতা আজিজুল হক সপনের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন মহলকে চাঁদা না দিলে ঠিকভাবে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পুলিশও কার্যকরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। নগরীর জরাকল বাজারের রিকশাচালক হাসেম আলী বলেন, ৩৬ বছর ধরে তিনি রিকশা চালাচ্ছেন। সম্প্রতি রাতে নিরালার মোড়ে ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে সারা রাতের উপার্জন হারিয়েছেন।
খুলনা মহানগরী ও আশপাশের উপজেলায় অপরাধ কর্মকাণ্ডে একাধিক অপরাধী চক্রের নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে রনি চৌধুরী ওরফে ‘গ্রেনেড বাবু’র নেতৃত্বাধীন ‘বি-কোম্পানি’, পলাশ গ্রুপ, হুমা বাহিনী, আশিক গ্রুপ ও ট্যাংকি শাওন গ্রুপ। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, অস্ত্র বহন ও আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, উঠতি বয়সী ও নিম্ন আয়ের যুবকদের মাসে অন্তত সাত হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে মাদক বিক্রি ও অস্ত্র বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। মাদকের টাকা ভাগাভাগি ও লেনদেনের বিরোধকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
খুলনা মহানগর পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, একসময় নগরীতে ২০০টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব গ্যাংয়ের অনেক সদস্যের বয়স বেড়েছে এবং তাদের একাংশ বিভিন্ন অপরাধী গোষ্ঠীতে যুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। পাশাপাশি নতুন গোষ্ঠীরও আবির্ভাব ঘটেছে। কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, মহানগরীর আটটি থানায় ১৮১ জন সন্ত্রাসী, ৫৮৪ জন মাদক বিক্রেতা ও ৬৯ জন চাঁদাবাজকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
খুলনা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এম শাকিলুজ্জামান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ৯০ শতাংশ হত্যা মামলার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন-৬-এর কমান্ডার নিস্তার আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ ঠেকানো এবং বিদেশে অবস্থান করে নগরীর পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা অপরাধীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।