নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় যুবদল নেতা ফকির জহিরুল ইসলামকে (৪৫) কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় ২১ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে আড়াইহাজারের কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক রিজভীকে। এছাড়া আরও ৮ থেকে ১০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
গত বুধবার রাতে সোনারগাঁ উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের চর কিশোরগঞ্জ এলাকায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। নিহত জহিরুলের স্বজনদের অভিযোগ, সাবেক ছাত্রদল নেতা মোবারক হোসাইনের বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন জহিরুল, আর সেই কারণেই তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যায় জহিরুলের ভাগনে ইসমাইল হোসেন বাদী হয়ে সোনারগাঁ থানায় এই মামলাটি দায়ের করেন। জানা গেছে, মামলার প্রধান আসামি রিজভী আড়াইহাজার উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্যসচিব মোবারক হোসাইনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
এদিকে, নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিহত জহিরুলের এক স্বজন অভিযোগ করেছেন যে, এজাহার থেকে ছাত্রদল নেতা মোবারক হোসাইনের নাম বাদ দেওয়ার জন্য তাঁদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি জানান, তাঁরা সময় হলে এই বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন।
নিহত জহিরুল ইসলাম আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের খালিয়ারচর গ্রামের আবদুর রহমানের ছেলে। তিনি ওই ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। পেশায় ফার্মাসিস্ট জহিরুল মুন্সিগঞ্জে ভাড়া বাসায় থেকে সোনারগাঁয়ের চরকিশোরগঞ্জ বাজারে একটি ফার্মেসি পরিচালনা করতেন।
মামলার এজাহারে জহিরুলের ভাগনে ইসমাইল অভিযোগ করেন, “আসন্ন কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তাঁর মামা ফকির জহিরুল ইসলাম চেয়ারম্যান পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ায় প্রতিপক্ষের কয়েকজন তাঁকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। তাঁকে বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি মোটা অঙ্কের চাঁদাও দাবি করা হয়েছিল।”
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় আড়াইহাজারের পুরোনো থানা-সংলগ্ন সিএনজি স্ট্যান্ডে জহিরুলের ওপর রিজভী ও তাঁর লোকজন হামলা চালায়। এ ঘটনায় তিনি বাদী হয়ে ওই বছরের ২৯ নভেম্বর আড়াইহাজার থানায় একটি মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
ইসমাইল হোসেনের অভিযোগ, আগের ওই মামলার আসামিদের পাশাপাশি অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিরাও তাঁর মামাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। এই আতঙ্কের কারণেই তিনি গ্রামের বাড়িতে না থেকে সোনারগাঁয়ের চরকিশোরগঞ্জ এলাকায় বসবাস করে ব্যবসা করতেন। তবে মাঝেমধ্যে গ্রামের বাড়িতে গিয়ে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থিতার বিষয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করতেন তিনি। এতেই রিজভীসহ আসামিরা তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, গত বুধবার রাত আটটার দিকে ফার্মেসি বন্ধ করে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন জহিরুল। রাত সাড়ে আটটার দিকে চর হোগলা এলাকার কাশেমনগরে দারুস সুন্নাহ খালেদ সিদ্দিকী মডেল মাদ্রাসার কাছে একটি কাঁচা রাস্তায় পৌঁছালে রিজভীর নেতৃত্বে ২১ জন এজাহারভুক্ত আসামি ও অজ্ঞাতনামা কয়েকজন তাঁর পথরোধ করেন। তাঁদের হাতে চাপাতি, রামদা, ছুরি, দা, লোহার রড, লাঠিসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র ছিল।
বাদীর অভিযোগ, হামলাকারীরা জহিরুলকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপান এবং লাঠি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। এরপর তাঁকে মৃত ভেবে রাস্তায় ফেলে রেখে তাঁরা দ্রুত পালিয়ে যান।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, এক পথচারী জহিরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের হোয়াটসঅ্যাপ থেকে রাত পৌনে নয়টার দিকে ইসমাইল হোসেনকে ফোন করে হামলার খবর জানান। পরে ইসমাইলসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় আহত জহিরুলকে অটোরিকশায় করে মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে নেওয়ার পথে জহিরুল ইসলাম হামলাকারীদের কয়েকজনের নাম এবং তাঁদের আঘাতের বিবরণ জানান। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকেরা উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। তবে ঢাকায় নেওয়ার প্রস্তুতির মধ্যেই মুন্সিগঞ্জ সদর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার বিষয়ে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মহম্মদ আবদুল বারিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “যুবদল নেতা জহিরুল ইসলাম হত্যার ঘটনায় ২১ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।”
কারও কারও নাম বাদ দিতে স্বজনদের ওপর চাপ দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি আরও বলেন, “মামলার তদন্তে হত্যার সঙ্গে যাদের জড়িত বা সম্পৃক্ত থাকার থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে, এজাহারে নাম না থাকলেও তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হবে।”