চট্টগ্রামের পটিয়ায় বাবার বাড়ি থেকে পাঠানো নাশতার পরিমাণ কম ছিল বলে অভিযোগ তুলে এক অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। শাশুড়ি ও দুই ননদের দ্বারা নির্যাতনের ফলে গুরুতর আহত ওই গৃহবধূ দীর্ঘ ৯ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর অবশেষে মৃত্যুবরণ করেছেন। গতকাল শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
নিহত গৃহবধূর নাম সিফাতুন নুর (২২)। তিনি তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। চট্টগ্রামের চন্দনাইশ পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরের মেয়ে সিফাতুনের সঙ্গে প্রায় পাঁচ মাস আগে পারিবারিকভাবে পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের মো. তারেকের (২৬) বিয়ে হয়। উল্লেখ্য, তারেক বর্তমানে দুবাইপ্রবাসী।
সিফাতুন নুরের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর সিফাতুনের মা জাহিনুর আক্তার মেয়েকে দেখতে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন। চট্টগ্রামের স্থানীয় রীতি অনুযায়ী আশ্বিন মাসে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে বিভিন্ন ধরনের নাশতা পাঠানোর প্রচলন রয়েছে। সেই রীতি মেনে জাহিনুরও সঙ্গে করে বিভিন্ন পিঠা ও ফল নিয়ে গিয়েছিলেন। তবে সিফাতুনের শাশুড়ি অভিযোগ করেন যে, আনা নাশতার পরিমাণ খুবই কম। তাঁর দাবি ছিল, এই নাশতা আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশিসহ মোট ৬০টি ঘরে বিলি করা সম্ভব হবে না। এই সামান্য বিষয় নিয়েই সিফাতুনের সঙ্গে তাঁর শাশুড়ি ও দুই ননদের তীব্র ঝগড়া হয়।
এই বিরোধের জের ধরে ১৪ অক্টোবর সিফাতুনকে নির্মমভাবে মারধর করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, তাঁর মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই দিন রাতেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানেই দীর্ঘ লড়াইয়ের পর গতকাল তাঁর মৃত্যু হয়।
মারধরের এই ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৪ অক্টোবর সিফাতুন নুরের বাবা মো. নুর বাদী হয়ে পটিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। সিফাতুন নুরের মা জাহিনুর আক্তার আজ দুপুরে মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “বিয়ের পর থেকেই তাঁর মেয়েকে শাশুড়ি ও দুই ননদ বিভিন্ন সময়ে নির্যাতন করেছেন। ১২ অক্টোবর সন্ধ্যায় তিনি মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ৪৫০টি পিঠা, ৪০টি পেয়ারা, এক কেজি বড় চিংড়ি মাছ, এক কেজি আপেল, আটটি ড্রাগন ফল, চার কেজি তেলাপিয়া মাছ ও তিন কেজি দুধ নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরও তাঁর মেয়ের শাশুড়ি নাশতা কম হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন।”
জাহিনুর আক্তার আরও জানান, “নাশতা দিয়ে তিনি ওই দিনই চলে এসেছিলেন। এ নাশতার ঘটনা নিয়েই তাঁর মেয়েকে শাশুড়ি মারধর করেছে। তাঁর মেয়ের দুই ননদও এ ঘটনায় জড়িত। মারধরের পর যখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে তখন তাঁদের জানানো হয়েছে সিফাতুন মাথা ঘুরে পড়ে গেছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে তিনি মেয়েকে আইসিইউতে ভর্তি অবস্থায় পেয়েছেন।”
ঘটনার বিষয়ে সিফাতুন নুরের দুই ননদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের বাড়িতে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তাঁরা বর্তমানে পলাতক। এই বিষয়ে পটিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও তদন্তকারী কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “নাশতা কম দেওয়া নিয়ে বিরোধের জেরে গৃহবধূকে মারধরের ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। এ মামলায় ওই গৃহবধূর শাশুড়ি ও দুই ননদকে আসামি করা হয়েছে। ঘটনার দিন কী হয়েছিল এবং কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
উপপরিদর্শক মোশারফ হোসেন আরও জানান, গৃহবধূর মৃত্যুর পর গতকাল তাঁর শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে (৬০) গ্রেপ্তার করে থানায় আনা হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।