বৈষম্য, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং শাসকদের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো যখন একত্রিত হয়, তখন সমাজ সাধারণত অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হয়। কিন্তু শাসকের পরিবর্তনের পরেও কেন কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী প্রবণতা থেকে যায়, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন ফাহমিদুল হক।
এই পরিস্থিতির কেন এমন হলো, তার একটি যথাযথ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক তথাকথিত বিশেষজ্ঞ ও সবজান্তা মানুষ ‘আগেই বলেছিলাম…’ এই ভঙ্গিতে কথা বললেও, লাখ লাখ মানুষ যারা একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক এবং নিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁদের আশাভঙ্গের উপশম হওয়া দরকার—অন্তত কার্যকারণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে হলেও। মুক্তিযুদ্ধের পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই প্রথম দেশব্যাপী এমন আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। রক্তপাত, হতাহতের সংখ্যা, ত্যাগের তীব্রতা এবং স্বৈরাচারের পতন—সব মিলিয়ে কোটি কোটি সাধারণ আন্দোলনকারী বিশ্বাস করেছিলেন যে, এবার হয়তো সত্যিই সবকিছু বদলে যাবে!
এর আগে লেখক মুক্তকণ্ঠ তেই লিখেছিলেন, ‘জুলাই স্পিরিট কী, লেখা ছিল গ্রাফিতিতে’। সেই গ্রাফিতিগুলোর খুব অল্প অংশই কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা দক্ষ শিল্পীদের হাতে আঁকা হয়েছিল। অধিকাংশ ছবি ও লেখা ছিল অপটু হাতে আঁকা, যার অর্থ হলো সেগুলো সাধারণ আন্দোলনকারী তরুণ বা জনতার সৃষ্টি। জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ আসলে কী চেয়েছিল, তা তারা গ্রাফিতির মাধ্যমেই লিখে-এঁকে জানিয়েছিল। আর সেটাই ছিল প্রকৃত জুলাই স্পিরিট।
শিল্পকলা একাডেমির ডিজিটাল আর্কাইভের ১১১টি গ্রাফিতি বিশ্লেষণ করে লেখক দেখিয়েছেন যে, পূর্ববর্তী বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচারী সরকারের বিরোধিতা ও পতনের দাবির পাশাপাশি একটি গণতান্ত্রিক-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে এবং সংস্কারের মাধ্যমে নতুন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে এবং নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রে ফেরার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং বিচারব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেছে—কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংস্কার নিয়ে প্রচুর আলোচনা হলেও প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্যযোগ্য কোনো সংস্কার বাস্তবায়িত হয়নি। অভ্যুত্থানের পরপরই রাজনৈতিক পক্ষগুলো যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে।
ফাথালি এম মোগাদ্দেম ইরানি বংশোদ্ভূত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক। তাঁর আলোচ্য বইটি প্রকাশিত হয়েছে জুলাই আন্দোলনের বছরই—২০২৪ সালে। গুণগত, তত্ত্বনির্ভর ও ঐতিহাসিক তুলনামূলক পদ্ধতিতে তিনি এই বইটির জন্য গবেষণা করেছেন। ঐতিহাসিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মোগাদ্দেম বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব পর্যালোচনা করেছেন। তবে এই লেখায় গণ-আন্দোলনকে বোঝার জন্য বিপ্লবের ধারণাগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়েছে।
মোগাদ্দেম প্রথমে উল্লেখ করেছেন যে, বাঁধভাঙা বানের তোড়ের মতো বিপ্লব আবির্ভূত হলেও তা আসলে সমাজে দীর্ঘকাল ধরে চেপে থাকা ক্ষোভ ও চাপের হঠাৎ বিস্ফোরণ। বৈষম্য, রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং শাসকদের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাওয়ার ফলে সমাজ অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হয়। আগের বিপ্লবগুলোতে সনাতনী যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো সহায়ক হতো, তবে বর্তমানে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বিপ্লবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে সফল বিপ্লব মানেই যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে তা নয়—মোগাদ্দেম যখন বিপ্লব-পরবর্তী সময় নিয়ে বিশ্লেষণ করেন, তখন এই অমোঘ সত্যটিই সামনে আসে।
বিপ্লববিষয়ক গবেষক মার্ক বেইসিঙ্গার জানান, ১৯৮৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫৬টি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, যা সফলভাবে ক্ষমতাসীন শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করতে পেরেছিল। এই সময়ে আরও ৬৭টি বিপ্লবের চেষ্টা করা হলেও সেগুলো শাসনক্ষমতা বদলাতে ব্যর্থ হয়। সম্প্রতি কেবল ২০২৫ সালেই ১১টি জেন-জি অভ্যুত্থান হয়েছে, যার ফলে অন্তত ৩টি দেশে সরকারের পতন ঘটেছে।
জেন-জি অভ্যুত্থানের ধরন আমাদের জানা—এই আন্দোলনে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা একক নেতৃত্ব থাকে না, ডিজিটাল মাধ্যমের ব্যাপক ও অভিনব ব্যবহার দেখা যায় এবং মৌলিক রাজনৈতিক পালাবদলের চেয়ে এক বা একাধিক নির্দিষ্ট ইস্যু ঘিরে আন্দোলন শুরু হয়। বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলন ছিল এই ধারারই একটি গণ-আন্দোলন।
মোগাদ্দেমের মতে, বিপ্লবের কেন্দ্রে রয়েছে মনস্তত্ত্ব, যাকে তিনি অভিহিত করেছেন ‘বিপ্লবের ধাঁধা’ হিসেবে। বিশেষ করে বিপ্লব-পরবর্তী হতাশার সর্বোত্তম ব্যাখ্যা মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে পাওয়া সম্ভব। এই ধাঁধাটি একটি বহুল প্রচলিত ফরাসি উক্তিতে প্রতিফলিত হয়েছে, ‘যত বেশি পরিবর্তন ঘটে, ততই সবকিছু আগের মতো থেকে যায়।’ বিপ্লবের এই ধাঁধার মূলে রয়েছে এমন এক উপলব্ধি—বিপ্লব ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের পর অনেক কিছু রূপান্তরিত হলেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোতে কার্যত তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটে না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও বেশি সত্য। বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে বিপ্লব হয়নি, বরং হয়েছে গণ-অভ্যুত্থান। বিপ্লবের ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষ, দল বা নেতৃত্বের অবিসংবাদিত ভূমিকা থাকে, যা এখানে অনুপস্থিত ছিল। উপরন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে, নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রে ফেরা হয়েছে; কিন্তু আমলাতান্ত্রিক কাঠামো, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, বিচারব্যবস্থা একই রকম থেকে গেছে—কোনো পরিবর্তন হয়নি।
সংস্কার নিয়ে বহু আলাপ হয়েছে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লক্ষ্যযোগ্য কোনো সংস্কার হয়নি। অভ্যুত্থানের পরপরই রাজনৈতিক পক্ষগুলো যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। সবই প্রায় আগের মতো চলেছে, কেবল দখলদারের চেহারা বদলেছে।
অতীতের বিপ্লবগুলো বিশ্লেষণ করে মোগাদ্দেম দেখিয়েছেন, বিপ্লবের পর প্রায়ই গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে একক কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন এক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নেতারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা সীমিত করেন এবং স্বৈরতন্ত্রের বিস্তার ঘটান। এটি মানবপ্রকৃতির অনিবার্য ফল নয়; বরং চরমপন্থীদের ক্ষমতা দখল ঠেকানোর জন্য যা জরুরি ছিল, দ্রুত ও সর্বসম্মত রাজনৈতিক আচরণ পরিবর্তন না করতে পারার ফল। গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলো তখন উভয়সংকটে পড়ে—চরমপন্থীদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে তাদের নিজেদেরও আগ্রাসী পন্থা অবলম্বন করতে হতে পারে, অথবা গণতান্ত্রিক নীতি বজায় রাখতে গিয়ে তারা ক্ষমতা থেকে দূরে ছিটকে যেতে পারে।
ইরানের অভিজ্ঞতা দেখায়, মধ্যপন্থী ও বামপন্থী নেতাদের সহিংসতা ব্যবহারে অনীহা কীভাবে চরমপন্থীদের কর্তৃত্ববাদী শাসন সুসংহত করার সুযোগ করে দিয়েছিল। রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তনের তুলনায় ধীরগতিতে ঘটে। ফলে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা আবারও ফিরে আসার সুযোগ পায়। এর ফলে স্বাধীনতা ও সাম্যের বিপ্লবী প্রতিশ্রুতি দমন-পীড়ন ও মতাদর্শিক প্রাধান্য বিস্তারের জোরাজুরিতে বদলে যেতে পারে।
ক্ষমতা একচেটিয়া করার জন্য উগ্র ডানপন্থীরা বলপ্রয়োগ, সহিংসতা ও নির্মম কৌশল ব্যবহারে অধিক প্রস্তুত থাকে। বিপরীতে উদারপন্থীরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি অঙ্গীকারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে। এ কারণে তারা এসব কৌশল ব্যবহারে বিরত থাকে। সর্বব্যাপী ক্ষমতার হঠাৎ পতনে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, সংগঠিত চরমপন্থীরা তার সুযোগ গ্রহণ করে। মোগাদ্দাম বিশ্লেষণ করে দেখাচ্ছেন, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর কীভাবে খোমেনির অনুসারীরা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে প্রান্তিক করে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
ইরানের বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিতে মোগাদ্দেম তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চিহ্নিত করেছেন। প্রথমত, আগের প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ক। শাহর শাসনামলে মসজিদ, ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে খোমেনির অনুসারীরা এই নেটওয়ার্কগুলোকে শাসনবিরোধী জনমত ও আন্দোলন সংগঠিত করার কাজে ব্যবহার করেন।
বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সরকার শত শত মডেল মসজিদ নির্মাণ করেছেন, ‘কওমি জননী’ উপাধি গ্রহণ করেছেন। নব্বইয়ের দশক থেকেই জামায়াতে ইসলামী বিএনপির রাজনৈতিক মিত্র ছিল। তবে আওয়ামী লীগও ইসলামি শক্তিগুলোর সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনে পিছিয়ে ছিল না।
জুলাই আন্দোলনে সৃষ্টি হওয়া দেশবদলের স্বপ্ন তারা ধূলিসাৎ করা শুরু করে জুলাইয়ের নাম দিয়েই। স্বপ্ন বেহাত হয়ে যাওয়ায় উদার মধ্যপন্থী চিন্তক ও সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়েছে, তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ঘরে ফিরে গেছে অনেকেই। কেউ কেউ এমনও বলেছে যে ‘জুলাই করে ভুল করেছি’। কিন্তু এ রকম হতাশাজনক পরিস্থিতি ইতিহাসে বিরল নয়; বরং প্রায়ই ঘটেছে, ফাথালি এম মোগাদ্দেমের বিশ্লেষণ তার সাক্ষ্য বহন করছে।
মুক্তকণ্ঠ র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে মোট ৭০টি ইসলামি দলের মধ্যে ৫টি ছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে, আর ৯০ শতাংশ ইসলামি দল ঐক্য করেছিল আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটে। এই পূর্ববর্তী নেটওয়ার্ক উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে পুষ্ট করেছে, শক্তি বৃদ্ধি করেছে। জুলাইয়ের আন্দোলনে তারাই আবার হাসিনবিরোধী পক্ষ হিসেবে কাজ করেছে এবং ৫ আগস্টের পর স্বরূপে আবির্ভূত হয়ে ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
দ্বিতীয়ত, বিপ্লবের সময় সাংগঠনিক তৎপরতার বর্ণনায় মোগাদ্দেম বলছেন, খোমেনির কট্টরপন্থী অনুসারীরা মসজিদ-সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কমিটির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করেন এবং ক্ষমতার একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
তৃতীয়ত, বিপ্লবের পর খোমেনির অনুসারীরা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর বিভক্তিকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশেও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জুলাই আন্দোলনে অবদান রেখেছে। অনেক মাদ্রাসাছাত্র প্রাণ দিয়েছেন। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যে নেতৃত্ব, তাতেও জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ছাত্রশিবির কৌশলগত অবদান রেখেছে। তবে আন্দোলন চলাকালে কৌশলগত কারণে তারা তাদের তৎপরতা প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি। সাধারণ জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতাও সীমিত ছিল।
কেবল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় কারও কারও বিরোধিতার ইতিহাস রয়েছে এমন নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও ইসলামি দলগুলোর রয়েছে বড় দুই দলের সঙ্গে লেজুড়বৃত্তির ইতিহাস। ৫ আগস্টের পর অবশ্য তারা নিজেদের স্বাধীন ও কর্তৃত্ববাদী অবয়ব নিয়ে হাজির হয়। আন্দোলনে অপ্রকাশ্য থাকলেও ৫ আগস্টের পর তারা জুলাই আন্দোলনের প্রধান ভাগীদার হিসেবে নিজেদের জাহির করা শুরু করে। তারা মূর্তি ভাঙতে থাকে, মাজার ভাঙতে থাকে, অমুসলিমদের জন্য বিরূপ আবহ তৈরি করে, মেয়েদের স্বাভাবিক চলাফেরায় বাধা তৈরি করে; আর জুলাইয়ের নামে যা খুশি করা শুরু করে—এমনকি কেউ কেউ চব্বিশ দিয়ে একাত্তরকে প্রতিস্থাপন করার কথা বলে।
জুলাইয়ের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, তারা যদি একটু প্রগতিশীল হয়, বাম ভাবাপন্ন হয়, তখন তাদের হরেদরে ইসলামবিদ্বেষী–ভারতপন্থী–শাহবাগি ইত্যাদি ডাকা শুরু হলো অনলাইন ও অফলাইনে মব তৈরির মাধ্যমে। তারা বইমেলায় হাঙ্গামা করে, পরিস্থিতি তৈরি করে কবিকে জেলে পাঠায়, হাসিনার আমলে নিপীড়িত ‘ইসলামপন্থী মজলুম’দের অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকা অ্যাকটিভিস্টকেও আত্মগোপনে যেতে বাধ্য করে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বারবার হামলা হয়েছে; আগুন দেওয়া হয়েছে মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার , ছায়ানট, উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানে।
আর দুর্বল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার শূন্যতা দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলোকে তাদের প্রাপ্যের তুলনায় অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে। গণতন্ত্রের পুনরুত্থানের পরিবর্তে আমরা এখন কর্তৃত্ববাদী কাঠামোরই পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখতে পেয়েছি। সহিংসতা ও দাপট দেখিয়ে এমন পরিস্থিতিও তারা তৈরি করেছিল, মনে হচ্ছিল ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেই তারা ক্ষমতায় আইনগতভাবে অধিষ্ঠিত হয়ে যাবে।
তাদের ফৌজদারি অপরাধমূলক কাজ-কারবার সম্ভবত শান্তিপ্রিয় মানুষেরা পছন্দ করেনি। নির্বাচনের মাধ্যমে মধ্যপন্থী দল বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। আবার নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী অতীতের যেকোনো নির্বাচনের চেয়ে ডানপন্থীরা অনেক ভালো করেছে। নির্বাচনের পর ডানপন্থীদের একচ্ছত্র সহিংসতা কমেছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি। বিএনপির মধ্যেও কট্টর ডানপন্থীদের একটা অংশ রয়ে গেছে। ফলে বলা যায়, আন্দোলন চলাকালে প্রকাশ্য না থাকলেও আগে থেকেই উগ্র ডানপন্থীরা সংগঠিত ছিল।
জুলাই আন্দোলনে সৃষ্টি হওয়া দেশবদলের স্বপ্ন তারা ধূলিসাৎ করা শুরু করে জুলাইয়ের নাম দিয়েই। স্বপ্ন বেহাত হয়ে যাওয়ায় উদার মধ্যপন্থী চিন্তক ও সাধারণ মানুষ হতভম্ব হয়েছে, তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ঘরে ফিরে গেছে অনেকেই। কেউ কেউ এমনও বলেছে যে ‘জুলাই করে ভুল করেছি’। কিন্তু এ রকম হতাশাজনক পরিস্থিতি ইতিহাসে বিরল নয়; বরং প্রায়ই ঘটেছে, ফাথালি এম মোগাদ্দেমের বিশ্লেষণ তার সাক্ষ্য বহন করছে। গণতান্ত্রিক অধিকার ও সাম্যের জন্য জুলাইয়ের যে অঙ্গীকার, বাংলাদেশের মানুষের বর্তমান ও ভবিষ্যতের রাজনীতি ও লড়াই বলে দেবে তার কতটুকু অর্জিত হবে বা অক্ষুণ্ন রবে।
ফাহমিদুল হক লেখক ও শিক্ষক
*মতামত লেখকের নিজস্ব