কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর শিকদার হত্যা মামলার প্রধান আসামি হেলালের সঙ্গে মামলার বাদী ও নিহতের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর কথোপকথনের একটি রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই ফোনালাপে জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদারের নাম উঠে এসেছে। ছড়িয়ে পড়া ৯ মিনিটের অডিও ও ৮ মিনিটের ভিডিওতে জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা ছিলেন, কীভাবে আসামিরা মিঠামইনে এসেছিলেন এবং অর্থের জোগান কে দিয়েছেন—এসব বিষয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
হেলালের দাবি, জাহাঙ্গীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, আহত করার জন্য তাদের পাঠানো হয়েছিল। এ ঘটনায় আলমগীরের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আলমগীর বলেছেন, তাকে ফাঁসাতে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, এলাকায় প্রভাব বিস্তার ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধ ছিল। গরুর হাট, ফেরিঘাট ও কাঠবাজারসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার নিয়েও আলমগীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তবে আলমগীরও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ফোনালাপে আলমগীরের নাম
ফোনালাপে হেলাল দাবি করেন, জাহাঙ্গীরকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তাকে কোপ দিয়ে আহত করার জন্য তাদের পাঠানো হয়েছিল। নেশার টাকা জোগাড়ের জন্য তারা এ কাজে রাজি হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। জাহাঙ্গীর মারা যাবেন, এমনটা তারা ভাবেননি বলে ফোনালাপে জানান হেলাল।
হেলালের ভাষ্য, তার বন্ধু রিয়াজের মাধ্যমে আলমগীরের সঙ্গে তাদের যোগাযোগের বিষয়টি জানতে পারেন। জাহাঙ্গীর ও আলমগীরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল এবং কিছুদিন আগে তাদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছিল বলে তাকে জানানো হয়। এই বিরোধের জেরে আলমগীর তাদের জাহাঙ্গীরকে মারার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন বলে অভিযোগ করেন হেলাল। তবে আলমগীর সরাসরি তাকে নির্দেশ দেননি; তার বন্ধু রিয়াজের মাধ্যমে বিষয়টি জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ফোনালাপে তাসলিমা জানতে চান, আলমগীর কি সরাসরি হেলালকে এসব কথা বলেছিলেন? জবাবে হেলাল বলেন, তার বন্ধু রিয়াজের সঙ্গে আলমগীরের সরাসরি যোগাযোগ ছিল।
হেলাল আরও দাবি করেন, সম্প্রতি কারাগারে গিয়ে উপজেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকা তাদের বকাঝকা করেন। আলমগীরের নাম বলার কারণে খোকা তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোরা কী জন্য আলমগীর ভাইয়ের নাম বললি? এখন কোন বাপে বাঁচাইবো?’
হেলালের অভিযোগ, আলমগীরের নাম বললে তাদের জামিন করাবে কে—এমন কথা বলে ভয় দেখানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও আলমগীরের নাম বলেছেন। তবে তার অভিযোগ, আলমগীরের নাম বললে তাদের বেশি মারধর করা হয়।
ফোনালাপে হেলাল আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কয়েক দিনের মধ্যে খোকাকে রিমান্ডে নেওয়া হলে তখনও আলমগীরের নাম আড়াল করার চেষ্টা হতে পারে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওরা আরেকটা গেম করতেছে।’
হেলাল আরও দাবি করেন, মিঠামইনে ১৫ থেকে ২০ দিন অবস্থান করার পর কারা তাদের সেখানে এনেছে, কারা হত্যাকাণ্ডের কাজটি করিয়েছে এবং কারা টাকা দিয়েছে—এসব বিষয়ে তিনি ধারণা পেয়েছেন। তার ভাষ্য, আলমগীরের একজন লোক তাদের খাওয়াদাওয়ার খরচ দিতেন। ওই ব্যক্তির নাম মনে না থাকলেও তাকে লম্বা, কালো এবং অন্য এলাকার একজন ইউপি সদস্য হিসেবে বর্ণনা করেন হেলাল। খোকা তাদের মিঠামইনে নিয়ে এলেও এর পেছনে আলমগীরের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ফোনালাপে তাসলিমা জানতে চান, হেলালকে কারাগার থেকে নিয়ে আসা হয়েছে কি না। জবাবে হেলাল বলেন, তিনি কারাগার থেকে আসেননি, ঢাকা থেকে এসেছেন।
ফোনালাপের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বাদী
নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী ফোনালাপের রেকর্ডটি সঠিক বলে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন আগে হেলাল তার সঙ্গে কথা বলেন। কথোপকথনে হেলাল কীভাবে মিঠামইনে এসেছেন, কে তাকে এনেছেন এবং কারা এ কাজে অর্থ দিয়েছেন—এসব বিষয়ে কথা বলেন।
তাসলিমার দাবি, জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডে আলমগীরের সংশ্লিষ্টতা নিয়ে তারা আগে থেকেই সন্দেহ করতেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন।
তবে আলমগীর শিকদার তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ বড় ধরনের ষড়যন্ত্রের অংশ। তার দাবি, তিনি সম্প্রতি মিঠামইন সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তার ভাবিও নিহত ভাইয়ের জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে চেয়ারম্যান হতে চান বলে অভিযোগ করেন আলমগীর। তাকে ফাঁসাতে নতুন করে নাটক সাজানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
আলমগীর প্রশ্ন তোলেন, তাসলিমার সন্দেহ থাকলে মামলা করার সময় তাকে আসামি করা হয়নি কেন। বর্তমানে তিনি সুইজারল্যান্ডে অবস্থান করছেন এবং শিগগিরই দেশে ফিরবেন বলে জানান। এর আগে দীর্ঘদিন সুইজারল্যান্ডে থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশে ফেরেন তিনি। আলমগীর কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক বলে জানা গেছে।
ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও ইউপি নির্বাচন নিয়ে বিরোধের অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিঠামইন সদর ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সুইজারল্যান্ড থেকে দেশে ফিরে আলমগীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেন। গরুর হাট, ফেরিঘাট ও কাঠবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, মিঠামইন সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা ছিল আলমগীরের। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সমর্থকদের প্রচারণামূলক পোস্টও দেখা যায়। জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া উপজেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকাও আলমগীরকে চেয়ারম্যান হিসেবে দেখতে চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়া নিয়ে দুই ভাইয়ের মতবিরোধের পাশাপাশি আলমগীরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ ছিল। এসব বিষয় নিয়ে প্রায়ই কথা-কাটাকাটি হতো। কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে আলমগীর তার বড় ভাই জাহাঙ্গীরকে মারধর করেছেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সামনেও তাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ রয়েছে।
যেভাবে হত্যা করা হয় জাহাঙ্গীরকে
গত ১৫ জুলাই রাত ৯টার দিকে মিঠামইন বাজার থেকে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহেদুল আলম জাহাঙ্গীর। মিঠামইন সদরের বেড়িবাঁধ এলাকায় নিজ বাসভবনের সামনে পৌঁছালে আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে জখম করে। এ সময় তার সঙ্গে থাকা বিএনপির কর্মী হাদিস মিয়াকেও কুপিয়ে আহত করা হয়।
স্বজনেরা তাদের উদ্ধার করে মিঠামইন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাত ১১টার দিকে চিকিৎসক জাহাঙ্গীরকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ১৮ জুলাই জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে মিঠামইন থানায় মামলা করেন। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১২ জনকে আসামি করা হয়। নাম উল্লেখ করা আসামিরা হলেন বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া গ্রামের হেলাল (২৪), লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার দুধরাজপুর গ্রামের মহিন উদ্দিন (৩২) এবং একই উপজেলার মধ্যপাড়া গ্রামের শাকিল হোসেন ওরফে শাহীন (২৫)।
পুলিশ জানিয়েছে, জাহাঙ্গীর হত্যা মামলায় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাসহ এ পর্যন্ত ১৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন মিঠামইন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক ইমরান হোসেন নৌশাদ, ছাত্রদল নেতা তরিক মোমেন, উপজেলা ছাত্রদলের বহিষ্কৃত আহ্বায়ক মোকাররম হোসেন খোকা এবং তার ভাতিজা মো. রিয়াজ।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার মিরপুর-১০ এলাকা থেকে খোকাকে এবং নেত্রকোনা শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে রিয়াজকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর খোকাকে ছাত্রদলের আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, একটি চক্র তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।
যেভাবে ছড়াল ফোনালাপ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মামলার বাদী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর এক স্বজন জানান, ফোনালাপটি গত ১৩ অক্টোবরের। ওই দিন অন্য এক আসামি স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ফোন করলে ফোনটি জাহাঙ্গীরের স্ত্রীর কাছে দিতে বলা হয়। তাকে জানানো হয়, মামলার প্রধান আসামি হেলাল তার সঙ্গে কথা বলবেন।
ওই স্বজনের দাবি, তখন ফোনের লাউডস্পিকার চালু রেখে কথোপকথনটি ভিডিও করা হয়। পরে ৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও এবং ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জারের মাধ্যমে তা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ কারাগারের জেল সুপার জাহানারা বেগম জানান, কারাবিধি অনুযায়ী একজন বন্দী প্রতি সপ্তাহে স্বজন ও আইনজীবীর সঙ্গে ১০ মিনিট কথা বলার সুযোগ পান। কোন বন্দি কবে কার সঙ্গে কথা বলেছেন, সেই তথ্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে সংরক্ষিত থাকে। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।