ভারতের পশ্চিমবঙ্গে দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা পুলিশ বাহিনীর দায়িত্ব নয়। তবে বিসর্জনের পুরো প্রক্রিয়া চলাকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথাযথভাবে বজায় রাখা অবশ্যই পুলিশের কর্তব্যের অন্তর্ভুক্ত।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাম্প্রতিক এক ঘোষণা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রেক্ষিতে গতকাল শুক্রবার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এই কথা জানিয়েছেন কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ।

ঘটনার সূত্রপাত ২১ অক্টোবর, যখন পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি দলীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী হুগলি নদীর ঘাট পরিদর্শন করেন। দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “আমি সিপিকে (পুলিশ কমিশনার) বলে গেলাম, যাঁরা মাকে নিয়ে যাবেন সেসব লোকজনের নাম, পরিচয়ও শনাক্ত করে দিতে হবে। যাঁরা সনাতন ধর্ম মানেন, তাঁরাই প্রতিমায় হাত দেবেন। এটার মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই।”

মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের অর্থ ছিল, প্রতিমা বহনের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় যাচাই করা এবং তারা সনাতন হিন্দু কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার্যত পুলিশের ওপর ন্যস্ত করা। এই নির্দেশনার পর রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ধর্মীয় আচার পালনের ক্ষেত্রে পুলিশকে কেন নজরদারির দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষ ও সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রশ্ন ওঠে।

মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশ অনুযায়ী পুলিশ কীভাবে বিসর্জনের ঘাটে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শনাক্ত করবে, সেই বিষয়ে গতকাল শুক্রবার খোদ পুলিশ কমিশনারকে প্রশ্ন করা হয়। জবাবে কমিশনার অজয় নন্দ কলকাতা পুলিশের অবস্থান পরিষ্কার করেন।

সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, “যা নির্দেশ এসেছে সেই মতো পূজা কমিটিকে বলা হয়েছে। সেভাবেই চলছে। পূজা কমিটি সবটা দেখছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা যে প্রথা প্রচলিত রয়েছে, এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটবে না। বিসর্জনের ধর্মীয় রীতিনীতিগুলো যথাযথভাবে পালন হচ্ছে কি না, তা লক্ষ্য রাখার দায়িত্ব কখনোই পুলিশের ওপর থাকে না। প্রতিমা বহনের জন্য নিযুক্ত কুলিদের বিষয়ে পূজা কমিটির কর্মকর্তারা নিজেদের আলোচনার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় পুলিশের একমাত্র কাজ হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং শান্তি বজায় রাখা।

উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি শাসনক্ষমতায় আসার পর এবারই রাজ্যে প্রথম দুর্গাপূজা উদযাপিত হলো। তবে এই উৎসবের আবহে বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। হিন্দুত্ববাদীদের হামলায় প্যান্ডেল সংলগ্ন বইয়ের স্টলে ভাঙচুর ও বই ধ্বংস করার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতা এবং উত্তর কলকাতার চোরবাগানে পূজামণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনাটি শোকের ছায়া নামিয়েছে। এই সামগ্রিক বিশৃঙ্খলা ও ব্যর্থতার জন্য শাসকদলের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন বিরোধী পক্ষ।