দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জনের সময় কেবল সনাতন ধর্মের অনুসারীরাই প্রতিমা স্পর্শ করতে পারবেন বলে নির্দেশ দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর এই নির্দেশকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজ্যে অস্পৃশ্যতা বা ছোঁয়াছুঁয়ির প্রাচীন প্রথা পুনরায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, তাঁর এই নির্দেশের পেছনে কোনো সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য নেই, বরং ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

কলকাতায় বুধবার থেকে দুর্গাপ্রতিমা বিসর্জনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা আগামী কয়েক দিন চলবে। বিসর্জনের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত বাবুঘাট পরিদর্শনে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করার পর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এটা তো একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, উৎসব তো বটেই, কিন্তু সেটা সেকেন্ডারি। প্রাইমারি হচ্ছে ধর্মীয় যে ঐতিহ্য, সেটাকে ঠিকঠাক রাখা।’

প্রতিমা বিসর্জনের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার বিষয়েও কড়া নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এমনকি মাকে যাঁরা নিয়ে যাবেন, লোকজন, তাঁদের নাম-পরিচয়ও আমি সিপিকে (পুলিশ কমিশনারকে) বলে গেলাম, চিহ্নিত করে দিতে হবে। যাঁরা সনাতন ধর্ম মানেন, তাঁরাই প্রতিমাতে হাত দেবেন। এটার মধ্যে কোনো সাম্প্রদায়িকতা নেই।’

উল্লেখ্য, কলকাতার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ এবং বিসর্জনঘাটে দীর্ঘকাল ধরে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ কর্মরত থাকেন। বিশেষ করে ভারী প্রতিমা বহন করে নদীতে নামানোর মতো কঠিন কাজে অনেক দিনমজুর ও শ্রমিক যুক্ত থাকেন। এই শ্রমিকদের মধ্যে দরিদ্র মুসলমানদের পাশাপাশি আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া এবং তফসিলি উপজাতিভুক্ত মানুষও রয়েছেন। অর্থের বিনিময়ে তাঁরা দুর্গাসহ বিভিন্ন প্রতিমা বহনের কাজ করে থাকেন, যাদের সবাই সনাতন ধর্মের অনুসারী নন।

পূজা আয়োজকরা যদি মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন, তবে অনেক শ্রমিক তাদের কাজ হারাতে পারেন। ফলে তাঁদের জীবিকার ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কলকাতা পৌর করপোরেশন সূত্রে জানা গেছে, শহরের বিসর্জনঘাটগুলোতে এই শ্রমিকেরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নির্দেশ কার্যকর হলে যাঁরা সনাতন ধর্ম মানেন না, তাঁরা প্রতিমা স্পর্শ বা বহনের কাজে অংশ নিতে পারবেন না। তবে এই পরিস্থিতিতে বিকল্প কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেন, ‘এতটা সংকীর্ণ কিন্তু হিন্দুধর্ম নয়, হিন্দুধর্ম উদার। আপনি কি ধর্ম দেখে দেখে, জাতপাত দেখে দেখে, দেখতে যাবেন, এ ছোঁবে, এ ছোঁবে না। শ্রীরামকৃষ্ণ এ কথা বলে যাননি। স্বামী বিবেকানন্দ এই হিন্দুত্ব দেখিয়ে যাননি। শ্রী চৈতন্য দেব এই হিন্দুত্ব দেখিয়ে যাননি।’

অন্যদিকে, কংগ্রেসের রাজ্য মুখপাত্র সুমন রায়চৌধুরী এই ঘটনাকে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক ও ন্যক্কারজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, রবীন্দ্র-নজরুলের বাংলায় এই ধরনের কথার অবতারণা হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষ দুর্গাপূজার আয়োজনে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সম্পৃক্ততার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আপনি আজকে বলছেন সনাতনীরা শুধুমাত্র ঠাকুরকে স্পর্শ করতে পারবে, মুসলমান কৃষকেরা যে পদ্মফুল চাষ করেন, সেই পদ্মফুল বাদ দিয়ে সন্ধিপূজা হয় দুর্গাপূজায়?’

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, পূজার বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করেন মুসলমান কারিগর ও জরিশিল্পীরা। তাঁর মতে, যেকোনো উৎসবে সব ধর্মের মানুষের একসঙ্গে আনন্দ করাই একটি সুস্থ সমাজের লক্ষণ।

কলকাতা শহরের সাবেক মেয়র ও প্রবীণ সিপিএম নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য অভিযোগ করেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর এই ধরনের মন্তব্য সরাসরি সংবিধানের পরিপন্থী এবং এর মাধ্যমে সমাজে মৌলবাদকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আপনি আজকে বলছেন সনাতনীরা শুধু ঠাকুরকে স্পর্শ করতে পারবে, মুসলমান কৃষকেরা যে পদ্মফুল চাষ করেন, সেই পদ্মফুল বাদ দিয়ে সন্ধিপূজা হয় দুর্গাপূজায়?’

ভারতীয় সমাজে জাতপাত ও ছোঁয়াছুঁয়ির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্ণের বিভাজন এবং জাতভিত্তিক রাজনীতি এখনো সক্রিয়। সংবিধানে অস্পৃশ্যতা নিষিদ্ধ হলেও সমাজ থেকে এই প্রথা পুরোপুরি দূর হয়নি। বিরোধীদের আশঙ্কা, মুখ্যমন্ত্রীর নতুন নির্দেশের ফলে পশ্চিমবঙ্গে সেই বিভাজন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। জনপ্রিয় ব্লগার সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘আমাদের যা কিছু গর্বের, যা কিছু নিজের, সবকিছু পুড়বেই। সবে তো ছোঁয়াছুঁয়ি দিয়ে শুরু হয়েছে, এরপর বর্ণভেদ, তারপর সতীদাহটাহ চলে এলেও আশ্চর্য হব না।’

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিমা বিসর্জনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের নামের তালিকা ইতিমধ্যে কলকাতার পুলিশ কমিশনার অজয় নন্দকে দেওয়া হয়েছে। বিসর্জন ঘিরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে এবং পুলিশের পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী বা এনডিআরএফকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শ্রমিকদের পরিবর্তে কাদের দিয়ে বিসর্জনের কাজ করানো হবে, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।