অভয়ারণ্য ঘোষণার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও কোনো পরিবর্তন আসেনি পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত যমুনা নদীর ৪০৮ হেক্টর এলাকায়। নেই কোনো সাইনবোর্ড, সীমানা চিহ্নিতকরণের উদ্যোগ কিংবা নিয়মিত তদারকি। এমনকি তিন দশক ধরে নদীতে মাছ ধরা জেলেরাও জানেন না এটি শুশুকের সংরক্ষিত এলাকা। ফলে সচেতনতা ও সুরক্ষার অভাবে যমুনায় দিন দিন কমে আসছে বিপন্ন জলজ প্রাণী মিঠাপানির ডলফিনের বিচরণ।
আজ ২৪ অক্টোবর বিশ্ব শুশুক দিবসেও নেই কোনো প্রশাসনিক তৎপরতা। এতে অভয়ারণ্যটির অস্তিত্ব এখন কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ।
পাবনার বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ থেকে নগরবাড়ী পর্যন্ত যমুনা নদীর প্রায় ৪০৮ হেক্টর এলাকাকে ২০১৩ সালে শুশুকের অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হয়। লক্ষ্য ছিল শুশুকের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা এবং এর বংশবৃদ্ধির উপযোগী পরিবেশ রক্ষা করা। কিন্তু ঘোষণার এক যুগ পেরিয়ে গেলেও অভয়ারণ্যটির সুরক্ষায় দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বললেই চলে। ২৪ অক্টোবর বিশ্ব শুশুক দিবসেও সেখানে বিশেষ কোনো আয়োজন কিংবা সচেতনতামূলক কার্যক্রম চোখে পড়েনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অভয়ারণ্য ঘোষণার পর শুশুক সংরক্ষণে প্রচার-প্রচারণা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম কিংবা নিয়মিত নজরদারির উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অভয়ারণ্যের সীমানায় নেই সাইনবোর্ড বা সতর্কতামূলক ব্যানার। ফলে স্থানীয় জেলে ও সাধারণ মানুষের কাছে এলাকাটির সংরক্ষিত বিষয়টি অজানাই রয়ে গেছে।
পরিবেশসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কাগজে-কলমে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে সংরক্ষণ কার্যক্রমের দৃশ্যমান নেই। নদীতে কারেন্ট জালের ব্যবহার, নৌযানের চলাচল এবং আবাসস্থলের পরিবর্তনের কারণে শুশুকের স্বাভাবিক বিচরণ ও বেঁচে থাকা হুমকির মুখে পড়ছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যমুনার এই অংশ থেকে শুশুক হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যমুনা নদীতে প্রায় ৩০ বছর ধরে মাছ ধরেন স্থানীয় জেলে মো. আবু সাঈদ। দীর্ঘদিন নদীতে মাছ ধরলেও শুশুকের অভয়ারণ্য সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। আবু সাঈদ বলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে যমুনা নদীতে মাছ ধরি, কিন্তু কখনো জানতে পারিনি এটা শুশুক অভয়ারণ্য। আগে নদীতে প্রায়ই শুশুক দেখা যেত, এখন খুব কম দেখা যায়। আমাদের মধ্যে শুশুক রক্ষায় কোনো সচেতনতাও নেই।’
হাটুরিয়া-নাকালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল হামিদও মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী শুশুক অভয়ারণ্য সম্পর্কে আগে জানতেন না বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী নদীর এই অংশ যে শুশুক অভয়ারণ্য, তা আমার জানা ছিল না। এই প্রথম জানলাম। মোহনগঞ্জ ঘাট এলাকায় সতর্কতামূলক ব্যানার বা সাইনবোর্ডও নেই, যেটা দেখে বোঝা যাবে। অভয়ারণ্যের অস্তিত্ব এখন কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ।’
বনপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, রাজশাহীর বনপ্রাণী পরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর কবির বলেন, আন্তর্জাতিক মিঠাপানির শুশুক দিবস উপলক্ষে মোহনগঞ্জ-নগরবাড়ী অভয়ারণ্যে সভা, সেমিনার বা অন্য কোনো অনুষ্ঠানের বিষয়ে তারা দাপ্তরিকভাবে নির্দেশনা পাননি। তিনি বলেন, নদীর নাব্যতা হ্রাস, দখল ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে অভয়ারণ্যটিতে শুশুকের বিচরণ কমে যাচ্ছে। অভয়ারণ্য ঘোষণার পর থেকে সেখানে মাঠপর্যায়ে তদারকির জন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবে শিগগিরই শুশুক রক্ষায় মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে।
শুশুক হত্যা, পাচার ও ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী এ ধরনের কর্মকাণ্ড দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে বলে তিনি জানান।