চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আম উৎপাদন, কৃষি এবং সীমান্ত বাণিজ্যের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কিছু মৌলিক সমস্যার কারণে শিল্পায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, গ্যাসের তীব্র সংকট এবং দুর্বল অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ। তাঁর সাথে কথা বলেছেন মুক্তকণ্ঠর চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি আনোয়ার হোসেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুল ওয়াহেদ বলেন, “চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতিতে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসী আয় ও সীমান্ত বাণিজ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে। এই জেলায় স্থলবন্দর ও রেলবন্দর আছে। মৌসুমি ফল আমের জন্যও সুখ্যাতি রয়েছে। এই জেলা থেকে বছরে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার আম বিভিন্ন জায়গায় যায়। ধান–চালসহ সব মিলিয়ে কৃষি উৎপাদনে আমরা উদ্বৃত্ত অবস্থায় আছি। পাশাপাশি এখানকার প্রায় ৯০ হাজার মানুষ বিদেশে কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো প্রবাসী আয়ও এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।”
এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শিল্পায়নের ধীরগতির কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং গ্যাসের অনুপস্থিতিই এখানে প্রধান সমস্যা। তিনি বলেন, “এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার এবং গ্যাস না থাকা। কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় কিছু প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তবে তা যেভাবে হওয়া উচিত ছিল, সেভাবে হচ্ছে না। এখানে আমসহ পেয়ারা, ড্রাগন, কলা—এসব ফলও প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এসব ফল প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সীমান্ত ও রেল যোগাযোগের বড় সুবিধাগুলো কাজে লাগাতে পারলে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও সীমান্ত বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। ছোট ব্যবসায়ীদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখানকার ছোট ব্যবসায়ীদের প্রধান সমস্যা হলো ব্যাংকঋণের সুদের হার বেশি। ফলে সুদের চাপে ছোট ব্যবসায়ীরা খেলাপি হয়ে পড়ছেন। তাই সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে নামিয়ে আনা উচিত।”
বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন শিল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা সম্পর্কে আবদুল ওয়াহেদ বলেন, “আমরা আমনুরায় কৃষিভিত্তিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড) স্থাপনের দাবি জানিয়ে আসছি। এখানে রেলওয়ের জংশন আছে। ফলে এখানে কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার ভালো সুযোগ আছে। রেলপথে ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে সাশ্রয়ী খরচে কাঁচামাল আনা যাবে এবং উৎপাদিত পণ্য এসব দেশে পাঠানো সম্ভব। এ ছাড়া রেলপথ ব্যবহার করে মোংলা বন্দর দিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা যায়। আমনুরায় কৃষিভিত্তিক ইপিজেড হলে ৩০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষিত ও বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হতে পারে।”
রহনপুর রেলবন্দরের বর্তমান অবস্থা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “রহনপুরকে পূর্ণাঙ্গ রেলবন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হলে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাড়বে।”
সোনামসজিদ স্থলবন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে করণীয় সম্পর্কে তিনি জানান, “সোনামসজিদ স্থলবন্দরের উন্নয়নে প্রায় ৩২০ কোটি টাকার সাসেক প্রকল্প সরকারের বিবেচনায় আছে। এটি বাস্তবায়িত হলে বন্দরের সক্ষমতা অনেক বাড়বে। একই সঙ্গে সোনামসজিদ থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণ করতে হবে। এতে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জের তরুণ ও নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা নিয়ে তিনি বলেন, “তরুণদের মধ্যে ব্যবসা–বাণিজ্য ও ছোটখাটো কৃষি উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাঁরা অটোমোবাইল ওয়ার্কশপও গড়ে তুলছেন। এই জেলায় প্রায় এক হাজার নারী উদ্যোক্তা আছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০–৭০ জন নারী উদ্যোক্তা বেশ ভালো করছেন।”
পরিশেষে, জেলার অর্থনীতিতে গতি আনার উপায় হিসেবে তিনি বলেন, “আমরা চাই, সোনামসজিদ স্থলবন্দরের উন্নয়ন, রহনপুর রেলবন্দরের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, আমনুরায় কৃষিভিত্তিক ইপিজেড স্থাপন এবং সোনামসজিদ–হাটিকুমরুল চার লেন সড়ক নির্মাণসহ বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলো পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো হোক। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”