ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার বুড়িরবাঁধে প্রতিবছরের মতো এবারও মাছ ধরার উৎসব শুরু হয়েছে। তবে উৎসবের আমেজ থাকলেও বড় মাছের দেখা নেই বললেই চলে। জেলা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরতে ভিড় করলেও অনেকেরই প্রাপ্তি হতাশাজনক। মাছ কম পাওয়ার পেছনে রিং জালের অবৈধ ব্যবহার এবং স্থানীয়দের দ্বারা খালের বিভিন্ন অংশ বাঁশ দিয়ে দখল করে রাখার অভিযোগ উঠেছে।
রাণীশংকৈল থেকে আসা জেলে বাবুল হোসেন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় জানান, গত কয়েক বছর ধরেই মাছের পরিমাণ কমছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “গত কয়েক বছর ধরে মাছ কম। তবে এবার মাছ নেই বললেই চলে। গতকাল রাত থেকে জাল ফেলছি। অল্প কিছু ছোট মাছ ছাড়া বড় কোনো মাছ জালে ওঠেনি। সব জায়গা বাঁশ দিয়ে দখল করে রেখেছেন স্থানীয় লোকজন। আর রিং জালের কারণে জালে মাছ উঠছে না। তাই মাছ না নিয়েই বাড়ি চলে যাচ্ছি।”
বাবুল হোসেনের মতো আরও অনেক জেলে এবার বুড়িরবাঁধে আশানুরূপ মাছ পাননি। তাদের দাবি, রিং জালের ব্যাপক ব্যবহার এবং বাঁশঝাড় দিয়ে খালের বিভিন্ন অংশ দখল করে রাখায় মাছ ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৮০ সালে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচের সুবিধার্থে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ও চিলারং ইউনিয়নের মধ্যবর্তী স্থানে একটি জলকপাট নির্মাণ করে। মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে প্রতিবছর এই জলকপাটে আটকে থাকা পানিতে বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা ছাড়া হয়। এই পোনাগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করেন আকচা ও চিলারং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা।
গত শুক্রবার রাতে বুড়িরবাঁধের জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর শনিবার সকাল থেকেই শুরু হয় মাছ ধরার মহোৎসব। এই উৎসবে ঠাকুরগাঁও জেলার পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও মানুষ অংশ নেন। পলো, ঠেলা, বাদাই, খেয়া, টানা, ফিকা ও কারেন্ট জালসহ নানা উপকরণ নিয়ে মাছ শিকারে নামেন তারা। অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশই মূলত শৌখিন মাছ শিকারি।
পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা বিশু পাল জানান, প্রতিবছর এই সময়ে পানি ছেড়ে দেওয়ার পর তারা মাছ ধরার উৎসবে মেতে ওঠেন। তবে এবার তার প্রাপ্তি খুব সামান্য। তিনি বলেন, “প্রতিবছর এই সময় বুড়িরবাঁধের পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। আমরা সবাই মাছ ধরার উৎসবে মেতে উঠি। তবে এবার তেমন মাছ পাইনি। অল্প কিছু দেশি মাছ ধরেছি। এগুলো নিয়েই বাড়ি ফিরব।”
পঞ্চগড় থেকে আসা তিন সদস্যের দলের একজন মাছ শিকারি আরিফ জানান, সারা রাতের পরিশ্রম বৃথা গেছে। তিনি বলেন, “গতকাল রাত থেকে কলাগাছের ভেলায় করে মাছ ধরছি। যা মাছ পেয়েছি, তাতে সারা রাতের কষ্ট বৃথা। বড় মাছ পেয়েছি তিনটি, যার ওজন হবে দুই কেজি। আর ছোট মাছ পেয়েছি প্রায় চার কেজি। আমরা মোট তিনজন পঞ্চগড় থেকে এসেছি। এতে আমাদের পোষাবে না।”
অন্যদিকে, বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা থেকে আসা মাহাবুব হোসেন জানান, পানি বেশি থাকায় তিনি সরাসরি বাঁধে নামতে পারেননি। সকাল ৬টায় নেমে এখন পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে তিন থেকে চার কেজি মাছ পেয়েছেন। তিনি বলেন, “রাতে মাছ ধরতে এসেছি। পানি বেশি থাকায় বাঁধে নামিনি। সকাল ৬টায় নেমেছি। এখন পর্যন্ত ছোট-বড় মিলিয়ে তিন থেকে চার কেজির মতো মাছ পেয়েছি। শুধু আমি নই, আমার এলাকার আরও বেশ কয়েকজন এসেছেন। আমরা মূলত শখের কারণে আসি। আর কিছুক্ষণ থাকব। যা পেয়েছি, তাতেই খুশি।”
শহরের রোড এলাকা থেকে আসা আব্দুর রহমান তার বন্ধুদের সাথে জাল কিনে মাছ ধরতে এসেছেন। বড় মাছ না পেলেও তিন কেজি ছোট মাছ পেয়েছেন তিনি। তার মতে, “মূলত শখের বশেই আসা। তবে মাছ ধরার আনন্দ অনেক। এখানে হাজার হাজার মানুষ মাছ ধরছেন।”
পঞ্চগড়ের বোদা থেকে আসা ইমু জানান, শখ করে দুই ভাই মিলে এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, “বুড়িরবাঁধে মাছ ধরার কথা অনেক শুনেছি। তাই দুই ভাই শখ করে মাছ ধরতে এসেছি। এখন পর্যন্ত দুই কেজির মতো মাছ ধরেছি। বড় কোনো মাছ এখনো ধরতে পারিনি।”
সদরের নারগুন ইউনিয়নের বসির আহম্মেদ অভিযোগ করেন, পানি ছাড়ার আগেই স্থানীয় অনেকে ছিপ দিয়ে বড় মাছগুলো ধরে ফেলেন। তিনি বলেন, “আগের মতো বাঁধে আর মাছ নেই। বাঁধের পানি ছাড়ার আগে আশপাশের লোকজন ছিপ দিয়ে বড় সব মাছ তুলে ফেলেন। স্থানীয় কিছু লোক বাঁশঝাড় দিয়ে সব জায়গা দখল করে রেখেছেন। তারপরও বিভিন্ন জেলা থেকে কয়েক হাজার মানুষ প্রতিবছর এখানে মাছ ধরতে আসেন। কেউ বেশি পান, কেউ কম। এখন বুড়িরবাঁধ মাছ ধরার উৎসবে পরিণত হয়েছে।”
আকচা ইউনিয়নের নওশাদ জানান, এই উৎসবের কারণে গ্রাম ও শহরের শত শত মানুষ এখানে ভিড় করেন। অনেকে জাল বা পলো ব্যবহার করেন, আবার অনেকে হাত দিয়েই মাছ ধরেন। তার মতে, “প্রতিবছরই এই মাছ ধরার উৎসব চলে। মাছ ধরতে জাল, খইয়া জাল, পলো ও মাছ রাখার খালুই নিয়ে গ্রাম ও শহরসহ বিভিন্ন এলাকার শত শত মানুষ আসেন। যাদের মাছ ধরার সরঞ্জাম নেই, তারা হাত দিয়ে মাছ ধরেন। এক কথায়, বুড়িরবাঁধ এলাকা মিলনমেলায় পরিণত হয়।”
মাছ কিনতে আসা আইনুল হক জানান, এবার মাছের অভাব স্পষ্ট। তিনি বলেন, “প্রতিবছর এই বাঁধ থেকে দেশি মাছ কিনে নিয়ে যাই। সকাল ৮টার দিকে এখানে দেশি মাছ কিনতে এসেছি। এখন প্রায় ১২টা বাজে। মাছ তেমন চোখে পড়েনি। অল্প কিছু মাছ উঠেছে, যার দাম দ্বিগুণ। তবে এবার মাছ না কিনেই ফিরতে হবে।”
আরেক ক্রেতা জানান, এবার মাছের দাম অনেক বেশি এবং কিছু পাইকার অন্য জায়গার মাছ এখানে এনে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, “এবার মাছের দাম অনেক বেশি। তবে কিছু পাইকার অন্য জায়গার মাছ এখানকার মাছ বলে বিক্রি করছেন। দাম অনেক, এবার আর তেমন মাছ নেই বললেই চলে। দুই কেজি রুই মাছ কিনেছি ৮০০ টাকায়।”
কালিবাড়ি বাজারের মাছ ব্যবসায়ী প্রবীর রায় জানান, তিনি নিয়মিত মাছ শিকারিদের কাছ থেকে মাছ কিনে বিক্রি করেন। তবে এবার মাছের পরিমাণ অনেক কম হওয়ায় দাম বেড়ে গেছে।
আকচা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান শিমলা রাণী রায় জানান, প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তিনি বলেন, “প্রতি বছর আশ্বিন মাসের প্রথম সপ্তাহে বুড়িরবাঁধের জমে থাকা পানি ছেড়ে দেওয়া হয় এবং মাছ ধরার জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আমাদের ইউপি সদস্যরা বুড়িরবাঁধ এলাকা দেখাশোনা করেন। বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ এসে এখানে মাছ ধরেন। এখানে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ পাওয়া যায়। এটি উৎসবে পরিণত হয়। তবে এবার মাছ কম। এবার মানুষের সংখ্যাও অনেক কম।”
ঠাকুরগাঁও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরাফাত উদ্দিন আহম্মেদ জানান, সুক নদীর ওপর নির্মিত ৫০ একর এলাকার এই বুড়িরবাঁধ একটি মৎস্য অভয়াশ্রম। সারা বছর এখানে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে এবং কর্মকর্তারা তদারকি করেন। শুধুমাত্র পানি ছাড়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি জানান, “এ বছর এখানে বিভিন্ন জাতের ২৫ কেজি মাছের রেণু ছাড়া হয়েছিল।”