ভূতের কথা উঠলেই অনেকের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা কাপড়ে ঢাকা এক অবয়ব। কখনো সেই ভূতের চোখের জায়গায় দুটি ছিদ্র থাকে, কখনো আবার লম্বা সাদা কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় তাকে ভেসে বেড়াতে দেখা যায়। সিনেমা, কার্টুন, গল্প বা হ্যালোইনের সাজসজ্জায় ভূতের এমন চেহারা বহুদিন ধরেই আমাদের কাছে পরিচিত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভূতকে সাদা রঙের কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় দেখানো হয় কেন? কালো বা অন্য কোনো রঙের কাপড় না কেন? এর পেছনে শুধু ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য না, আছে ইতিহাস, প্রাচীন সমাধি প্রথা, লোককথা এবং নাট্যজগতের বিশাল প্রভাব।
ভূতের সাদা কাপড়ের এই পরিচিত রূপ এক দিনে তৈরি হয়নি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও বিনোদনের নানা মাধ্যমের মধ্য দিয়ে এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মৃতদেহের কাফন থেকে ভূতের কাপড় সাদা
ভূতকে সাদা কাপড়ে দেখানোর পেছনে সবচেয়ে পরিচিত ব্যাখ্যাটি হলো প্রাচীন সমাধি প্রথা। কয়েক শতাব্দী আগে ইউরোপের অনেক জায়গায় মৃতদেহ কফিনে না রেখে পাতলা কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে সমাহিত করা হতো। এই কাপড়কে বলা হতো কাফন বা burial shroud।
মৃতদেহ মোড়ানোর জন্য সাদা লিনেন কাপড় ব্যবহার করা হতো। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের কাছে আলাদা কাফন কেনার সামর্থ্য না থাকলে মৃত ব্যক্তির বিছানার চাদর দিয়েই দেহ মোড়ানো হতো।
তখনকার মানুষের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, মৃত ব্যক্তির আত্মা কখনো কখনো জীবিতদের জগতে ফিরে আসতে পারে। তাই কল্পনায় ভূতকে মৃতদেহের কাফনে মোড়ানো অবস্থায় দেখানো হতো। ধীরে ধীরে এই চিত্র লোককথা ও শিল্পের মাধ্যমে পরিচিত হয়ে ওঠে।
মধ্যযুগের গল্প ও ছবিতে ভূতের সাদা পোশাক
ইউরোপের মধ্যযুগে ভূত নিয়ে বিভিন্ন গল্প প্রচলিত ছিল। এসব গল্পে মৃতদের অনেক সময় কঙ্কাল বা কাফনে মোড়ানো অবয়ব হিসেবে দেখানো হতো।
এর একটি উদাহরণ হলো ‘The Three Living and the Three Dead’ নামের একটি মধ্যযুগীয় কাহিনি। এতে তিনজন জীবিত মানুষের সামনে তিনটি মৃতদেহ বা কঙ্কালের আবির্ভাব ঘটে। তারা জীবিতদের মৃত্যু ও মানুষের নশ্বরতা সম্পর্কে সতর্ক করে।
১৩০০-এর দশকের কিছু চিত্রকর্মেও কাফনে মোড়ানো মৃতদেহের এমন ছবি দেখা যায়। পরবর্তী সময়ে ভূতের গল্প ও মানুষের কথিত অতিপ্রাকৃত অভিজ্ঞতার বর্ণনায় সাদা কাফনের উপস্থিতি আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।
সাদা কাপড় পরে মানুষও ভূত সাজত
ভূতের সাদা পোশাকের জনপ্রিয়তার পেছনে একটি মজার, আবার কিছুটা ভয়ংকর ইতিহাসও আছে। অতীতে কিছু মানুষ সাদা চাদর গায়ে দিয়ে ভূত সেজে অন্যদের ভয় দেখাত।
ইংল্যান্ডে ১৫ ও ১৬ শতকের দিকে এমন ছদ্মবেশের ব্যবহার দেখা যায়। সাদা কাপড়ে শরীর ঢেকে রাখলে একজন মানুষের চেহারা সহজে চেনা যেত না। এতে রাতের অন্ধকারে মানুষকে ভয় দেখিয়ে লুটপাট করার সুযোগ তৈরি হতো।
ইংরেজ লেখক রেজিনাল্ড স্কট ১৫৮৪ সালে প্রকাশিত তার The Discoverie of Witchcraft বইয়েও সাদা চাদর পরে মানুষকে প্রতারিত করার বিষয়টি উল্লেখ করেছিলেন। অর্থাৎ, সাদা কাপড়ে ঢাকা ভূতের ধারণা শুধু গল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বাস্তবে ভূত সেজে মানুষকে ভয় দেখানোর ঘটনাও এই ধারণাকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রেখেছিল।
নাটক ও সিনেমায় যেভাবে জনপ্রিয় হলো সাদা ভূত
সময়ের সঙ্গে ভূতের সাদা পোশাক গল্পের পাতা থেকে নাট্যমঞ্চেও জায়গা করে নেয়। উনিশ শতকে ইউরোপের নাটক ও মঞ্চনাট্যে ভূতের দৃশ্য তৈরি করতে সাদা পোশাক এবং বিভিন্ন আলোকপ্রক্ষেপণের কৌশল ব্যবহার করা হতো।
সাদা কাপড়ের সুবিধা ছিল, কম আলোতেও দর্শকের চোখে তা সহজে পড়ত। অভিনেতার শরীর ঢেকে একটি ভৌতিক অবয়ব তৈরি করাও তুলনামূলক সহজ ছিল। পরবর্তী সময়ে কথিত আত্মার ছবি তোলার জন্য ব্যবহৃত কিছু কৌশলেও সাদা কাপড়ে ঢাকা অবয়ব দেখা যায়।
এভাবে সাদা কাপড়ের ভূত ধীরে ধীরে মানুষের পরিচিত সাংস্কৃতিক চিত্র হয়ে ওঠে। তবে সব গল্প, নাটক বা চলচ্চিত্রে ভূতকে একই রকম দেখানো হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভূতকে সাধারণ পোশাক, বর্ম বা মৃত অবস্থায় পরা পোশাকেও দেখানো হয়েছে।
ভয়ংকর ভূত থেকে মজার চরিত্র
একসময় সাদা কাপড়ে ঢাকা ভূতের ছবি মানুষের মনে ভয় তৈরি করত। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে কার্টুন ও শিশুতোষ বিনোদনের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই চেহারার অর্থও বদলাতে থাকে।
১৯৩৭ সালে ডিজনির The Lonesome Ghosts কার্টুনে ভূতকে তুলনামূলক মজার চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়। পরে Casper the Friendly Ghost চরিত্রটিও ভূতকে শিশুদের কাছে বন্ধুসুলভ করে তোলে।
এভাবে সাদা কাপড়ের ভূত আর শুধু ভয় দেখানোর প্রতীক থাকেনি। হ্যালোইনের পোশাক, সাজসজ্জা, কার্টুন ও হাস্যরসের অংশ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
তাহলে ভূত কি সত্যিই সাদা?
ভূতকে সাদা কাপড়ে দেখানোর পেছনে ইতিহাস ও সংস্কৃতির ব্যাখ্যা থাকলেও, ভূতের অস্তিত্ব বা তার নির্দিষ্ট রং সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো প্রমাণ নেই। সাদা ভূত মূলত মানুষের কল্পনা, লোককথা, প্রাচীন সমাধি প্রথা এবং বিনোদনমাধ্যমের প্রভাবে তৈরি একটি পরিচিত চিত্র।
তাই ভূতকে সাদা দেখানোর কারণ হিসেবে কোনো অতিপ্রাকৃত নিয়মের কথা বলা যায় না। বরং মৃতদেহের কাফন থেকে শুরু করে নাটক, সিনেমা ও কার্টুনের হাত ধরে এই চেহারা জনপ্রিয় হয়েছে বলেই ইতিহাসবিদেরা ব্যাখ্যা করেন।
ভূতকে সাদা কাপড়ে দেখানোর পেছনে আছে দীর্ঘ ইতিহাস। প্রাচীনকালে মৃতদেহ মোড়ানোর সাদা কাফন, মধ্যযুগের লোককথা, ভূত সেজে মানুষকে ভয় দেখানোর ঘটনা এবং নাটক ও সিনেমার উপস্থাপনা মিলেই এই পরিচিত চেহারা তৈরি করেছে।
আজকের দিনে সাদা চাদর গায়ে দিয়ে ভূত সাজা যেমন হ্যালোইনের জনপ্রিয় রীতি, তেমনি কার্টুন ও গল্পেও এটি পরিচিত একটি প্রতীক। অর্থাৎ, ভূতের সাদা পোশাকের রহস্যের উত্তর অতিপ্রাকৃত জগতে নয়, বরং মানুষের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ম্যাগাজিন রিডার্স ডাইজেস্ট-এ ‘Here’s Why We Always Picture Ghosts in White—And What Paranormal Experts Think They Actually Look Like’ শিরোনামে প্রকাশিত আর্টিকেলের অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন সারিকা সাইয়ারা।