চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কেরু অ্যান্ড কোম্পানি প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে দেশজুড়ে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। তবে এই চোখধাঁধানো সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হলো প্রতিষ্ঠানটির ডিস্টিলারি বিভাগ। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে চিনি বিভাগের ক্ষেত্রে, যেখানে কোটি কোটি টাকার লোকসান প্রতিষ্ঠানটির সামগ্রিক সাফল্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে এই চিনি ইউনিটের ক্রমাগত লোকসান অব্যাহত রয়েছে।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও কেরুর চিনি বিভাগে ৬০ কোটি টাকারও বেশি লোকসান হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সর্বশেষ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরসহ গত পাঁচ বছরে চিনি উৎপাদন করতে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২০ কোটি টাকারও বেশি।

কেরুর চিনি বিভাগের বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই এই ইউনিটে ধারাবাহিকভাবে লোকসান হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৬০ কোটি টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় ৭০ কোটি টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা।

চিনি বিভাগে এই বিশাল লোকসানের পেছনে প্রধান দুটি কারণ সামনে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে। প্রথমত, ওই এলাকায় উন্নত জাতের আখের তীব্র সংকট রয়েছে। চাষিদের সরবরাহ করা নিম্নমানের আখের কারণে চিনি আহরণের হার বা রিকভারি রেট অত্যন্ত কম থাকে। দ্বিতীয়ত, উৎপাদন প্রক্রিয়ার ত্রুটি এবং সনাতন পদ্ধতির কারণে চিনি তৈরির খরচ বাজারের প্রচলিত বিক্রয়মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যায়। ফলে বাজারে চিনি বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে চিনি বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল জরাজীর্ণ ও পুরোনো যন্ত্রপাতির মাধ্যমে। ফলে চিনি মাড়াইয়ের মৌসুমে প্রায়ই যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিত, যা উৎপাদন ব্যাহত করার পাশাপাশি লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দিত।

আকুন্দবাড়িয়া গ্রামের আখ চাষি আশাদুল হক বলেন, “সঠিক সময়ে ভালো মানের বীজ ও পর্যাপ্ত তদারকি না পাওয়ায় অনেকেই আখ চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন। আখের দাম ও চাষের খরচের বৈষম্যের কারণেও ক্ষোভ ছিল তাদের মধ্যে।”

অন্যদিকে কারখানার শ্রমিকদের মতে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শ্রমের অপচয় বেশি হতো, যা সামগ্রিক খরচ বাড়িয়ে দিত। এই দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা কাটাতে সম্প্রতি ১০২ কোটি টাকা ব্যয়ে কেরুর আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং কারখানার আধুনিকায়নের ফলে এবার লোকসান কমে আসবে বলে জোরালো প্রত্যাশা করছেন সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বিক হাসান বলেন, “আধুনিকায়ন প্রকল্পের সুফল আগামী মৌসুম থেকেই মিলবে বলে আমরা আশা করছি। চাষিদের উন্নত জাতের বীজ সরবরাহ এবং সঠিক তদারকির মাধ্যমে চিনি ইউনিটকে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের করে আনতে ইতিমধ্যে মাঠে নেমে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”

সংশ্লিষ্টদের মতে, আধুনিকায়ন প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে চিনি বিভাগ যদি লোকসান কাটিয়ে লাভজনক হতে পারে, তবে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির সামগ্রিক রাজস্ব আয় আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এখন দেখার বিষয়, ১০২ কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্প ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের চিনি ইউনিটকে কতটা আলোর মুখ দেখাতে পারে।