জ্বালানি তেল, এলপিজি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষ চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এনসিপির প্রচারপত্র বিতরণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এখন একজন মানুষ বাজারে গেলে একটা বা দুইটা আইটেমের বেশি সবজি কিনতে পারে না। একটা মধ্যবিত্ত পরিবার মাসে যে ডিম খেত, তা অর্ধেকের বেশি তাদের নামিয়ে আনতে হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য মধ্যবিত্তেরও ক্রয়ক্ষমতার ঊর্ধ্বে চলে গিয়েছে।’

বাজেট অধিবেশনের সময় সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের দাবি ছিল যে, বাজেটের পর কোনো জিনিসের দাম বাড়েনি এবং সামনেও বাড়বে না। এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘মহান জাতীয় সংসদে সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁরা এ ধরনের মিথ্যা ও প্রতারণামূলক কথা জনগণকে বলেছেন।’

আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর শাহবাগে এক গণবিক্ষোভ কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছে এনসিপি। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই কর্মসূচির প্রচারের জন্য সপ্তাহব্যাপী প্রচারপত্র বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।

কেন কারওয়ান বাজার থেকে এই প্রচার শুরু করা হলো, সে বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কারওয়ান বাজার ঢাকার কাঁচাবাজার, সবজি—সবকিছুর একটা কেন্দ্র। এখানে আমরা চাঁদাবাজি, দখলদারির কথা শুনি। সে জন্য আমরা কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করছি। বাংলাদেশের যেসব জায়গায় চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, দখলদার, সিন্ডিকেটবাজরা আধিপত্য বিস্তার করে জনগণের দুর্ভোগ তৈরি করছে, তার বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং এসব সন্ত্রাস-দখলদার বাহিনীকে প্রতিহত করতে হবে।’

দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, একদিকে সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের দমনে ব্যর্থতা এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষ, বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে। তিনি আরও বলেন, গণমাধ্যম যদি বস্তুনিষ্ঠ তথ্য পরিবেশন করতে চায়, তবে বর্তমানে তাদের স্বাধীনতার কোনো সুযোগ নেই। সামগ্রিক এই পরিস্থিতিতে দেশের মানুষ নিজেদের অসহায় বোধ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বর্তমান সরকারকে ‘গণবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, এই সরকারকে অগণতান্ত্রিক বলা যায়, কারণ তারা প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করেনি। তিনি মনে করেন, গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী এই সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া জনগণের অধিকার আদায় সম্ভব হবে না। ঢাকা মহানগরের বাসিন্দারা চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও দখলদারদের কারণে চরম নিরুপায় হয়ে পড়েছেন বলে তিনি দাবি করেন।

সার্বিক ব্যর্থতার কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি জানান নাহিদ ইসলাম।

‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’

বর্তমান বিরোধী দল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে এক হয়ে গেছে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সরকারপ্রধানের জায়গা থেকে যে বক্তব্যটা এসেছে, তা একেবারে অনাকাঙ্ক্ষিত। একটা কথা আছে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো। নির্বাচনের আগে সুস্পষ্টভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংককে কাছে টানার জন্য তারা হেন কাজ নেই, যা করেনি। এখনো তারা আওয়ামী লীগ ও ভারতের সঙ্গে একধরনের সমঝোতা করে দেশ চালাচ্ছে। গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে কী হবে, সেটা তারা এখনো বলতে পারছে না।’

এবারের দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ‘সরকার দেশের মানুষের কোনো ধরনের নিরাপত্তাই দিতে পারেনি, পারছে না। বরং সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন বিরোধী দল, আমাদের মাদ্রাসার ছাত্ররা রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে এই পূজায় সহযোগিতা করেছে এবং হিন্দু ভাইবোনেরাও সাদরে এই সহযোগিতা নিয়েছেন।’

অনুষ্ঠানে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জানান, আগামী ৩০ অক্টোবর বেলা তিনটায় শাহবাগে এনসিপির গণবিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে এবং তিনি সবাইকে এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তাঁদের দুজনের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা শহরের মানুষকে চাঁদাবাজ, দখলদার ও সন্ত্রাসীদের হাত থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমাদের দুই কান্ডারি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে ঢাকা শহরে চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, দখলদার ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান ও গণবিক্ষোভ চলমান থাকবে।’

বক্তব্য শেষে নাহিদ ইসলামসহ এনসিপির নেতৃবৃন্দ কারওয়ান বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের মাঝে প্রচারপত্র বিতরণ করেন।