ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা, নিরাপত্তা এবং তাঁর ক্ষমতা প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। তবে দেশটির জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আবদুল মজিদ হাকিম ইলাহি দাবি করেছেন, মোজতবা খামেনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং নিয়মিতভাবে তাঁর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, গত সপ্তাহেই ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মোজতবার দীর্ঘ সাত ঘণ্টার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উল্লেখ্য, আট মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মোজতবা খামেনির বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আবদুল মজিদ বলেন, মোজতবা ‘খুব, খুব, খুব সুস্থ আছেন’ এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাঁর দায়িত্ব পালন করছেন।

ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিন এক বিমান হামলায় দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। বাবার মৃত্যুর পরপরই সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন মোজতবা খামেনি। তবে সেই সময় থেকে তিনি আর জনসমক্ষে উপস্থিত হননি; কেবল লিখিত বিবৃতির মাধ্যমেই তাঁর মতামত বা বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।

মোজতবা খামেনির এই রহস্যময় অনুপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয় যখন তাঁর বাবার দাফন অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যায়নি। জুলাই মাসে দাফন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও তিনি জনসমক্ষে না আসায় তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। এমনকি তিনি আদৌ জীবিত আছেন কি না, সেই আশঙ্কাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হতে থাকে।

তবে বাবার দাফন অনুষ্ঠানে মোজতবা উপস্থিত ছিলেন না—এমন দাবি সরাসরি নাকচ করেছেন আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তার কারণে তিনি সংবাদমাধ্যমের সামনে আসেননি, তাঁকে কেউ দেখেনি। কিন্তু তিনি তাঁর বাবার দাফনের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। তখন আমি ইরানে ছিলাম। তাঁর দুই ভাইয়ের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। মোজতবা খামেনিও সেখানে ছিলেন।’

এই কূটনীতিক আরও দাবি করেন যে, মোজতবা খামেনি মাঝেমধ্যে রাতে গোপনে রাস্তায় বের হন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘কোনো কোনো রাতে তিনি রাস্তায়ও আসেন। ইরানে জনগণের বিক্ষোভেও তিনি অংশ নিয়েছেন। তিনি খুব ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ এবং ইরানের দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চাপে দেশটির শাসনব্যবস্থা এখন চরম সংকটের মুখে। এমন সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসলে কে নিচ্ছেন, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে। ইরানের কিছু জ্যেষ্ঠ সূত্র ও কর্মকর্তার দাবি, মোজতবা খামেনি এখনো ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন এবং নিরাপত্তার খাতিরেই আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন। তবে কিছু ভিন্ন সূত্রের দাবি, বিমান হামলায় তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং চেহারার বিকৃতি ঘটেছে, যার ফলে তিনি দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের বড় অংশ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর আগেও মোজতবা খামেনি জনসমক্ষে খুব একটা আসতেন না। বাবার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে তিনি পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করতেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি অনুযায়ী, তিনি নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করছেন, বিস্তারিত প্রতিবেদন গ্রহণ করছেন এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। যদিও এই দাবিগুলোর স্বপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

কূটনীতিকের দাবি ছিল, ‘কোনো কোনো রাতে তিনি রাস্তায়ও আসেন। ইরানে জনগণের বিক্ষোভেও তিনি অংশ নিয়েছেন। তিনি খুব ভালোভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।’

অন্যদিকে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বক্তব্যে কিছুটা অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। গত ২১ জুলাই তিনি বলেছিলেন, সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ‘দিন দিন বাড়ছে’। কিন্তু আগস্টের শুরুতে তিনি জানান, মোজতবা খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা ‘খুব কঠিন’।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, জুলাইয়ের শেষ দিকে মোজতবা খামেনি ও পেজেশকিয়ানের এক বৈঠকে সামরিক কৌশল এবং অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনার মূল বিষয় ছিল সম্পদ সংগ্রহ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদেশি অংশীদারদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন। এর আগে মে মাসেও রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছিল, মোজতবা খামেনির সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা বৈঠক করেছেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর এটিই ছিল তাঁদের প্রথম প্রকাশ্যে আসা বৈঠকের খবর।

এদিকে, চলতি মাসের শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরানের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি আসলে কে পরিচালনা করছেন তা কেউ জানেন না। ট্রাম্প বলেন, ‘তাদের নেতারা মারা গেছেন, দ্বিতীয় সারির নেতারাও মারা গেছেন। দেশটি আসলে কে চালাচ্ছেন, কেউ জানে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা চলছে। তবে ইরানের বর্তমান ক্ষমতাকাঠামোয় তাঁদের প্রকৃত কর্তৃত্ব কতটুকু, তা স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করেছে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা খুব ভালোভাবেই জানেন তাঁদের প্রতিপক্ষ কারা এবং ইরানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করে।