মাত্র দুই মাস আগে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে আস্থাভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ তুলেছিল এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। বিশেষ করে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছিল সংস্থাটি। তবে এবার সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আগামী বছরের ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগে এই সমর্থন সুইস-ইতালিয়ান ফুটবল কর্মকর্তার জন্য বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) জাপানের টোকিওতে আয়োজিত এএফসির বিশেষ কংগ্রেসে ইনফান্তিনোর প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন সংস্থাটির সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা। উক্ত অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি নিজেও উপস্থিত ছিলেন। সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সামনে ইনফান্তিনোকে আলিঙ্গন করে তার নেতৃত্বের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেন শেখ সালমান।

এএফসি সভাপতি বলেন, ‘ফিফা সভাপতি হিসেবে নতুন মেয়াদের জন্য আপনি যখন এগিয়ে যাচ্ছেন, তখন আপনাকে ও আপনার নেতৃত্বকে সমর্থন দেওয়ার পূর্ণ অঙ্গীকার আমরা আবারও করছি।’

এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ফুটবল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টিও উল্লেখ করেন শেখ সালমান। তিনি বলেন, ‘আপনি এশিয়ার অনেক দেশ সফর করেছেন। এই মহাদেশের অনেক সদস্যের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আপনার প্রতি তাদের সমর্থন স্পষ্ট।’

আগামী বছরের মার্চ মাসে ফিফা সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাটির নেতৃত্বে থাকা ইনফান্তিনো এই নির্বাচনে টানা চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব পেতে আগ্রহী। তবে সাম্প্রতিক কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপের কারণে তার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপের বেশ কিছু প্রভাবশালী ফুটবল সংস্থার সঙ্গে তার মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।

সবচেয়ে বড় বিতর্কটি তৈরি হয় বিশ্বকাপসহ ফিফার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক স্বত্বে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে। প্রায় ৪২০ কোটি ডলারের সেই প্রকল্পের আওতায় ফিফার প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল সেখানে।

অভিযোগ ওঠে যে, ফিফার সদস্য সংস্থা এবং মহাদেশীয় ফুটবল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা ছাড়াই এই পরিকল্পনাটি এগিয়ে নিয়ে গেছেন ইনফান্তিনো। গত আগস্টে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের কনকাকাফের সঙ্গে যৌথভাবে এর বিরোধিতা করেছিল এএফসি। ইনফান্তিনোর এই পদক্ষেপকে আস্থার গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল ওই তিন সংস্থা।

তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি বাতিল করতে হয়। গত সপ্তাহে জুরিখে অনুষ্ঠিত ফিফা কাউন্সিলের বৈঠকে এই প্রকল্প নিয়ে ভুল করার জন্য ক্ষমাও চেয়েছেন ইনফান্তিনো।

তবে সেই পুরনো বিরোধ আর সামনে টেনে আনতে চান না শেখ সালমান। শুক্রবারের বক্তব্যে তিনি অতীতের মতপার্থক্যের কথা স্বীকার করেন। এএফসি সভাপতি বলেন, ‘জিয়ান্নি, এটা পরিষ্কার করে বলতে চাই, অতীতে কিছু বিষয় নিয়ে আমাদের মধ্যে সমস্যা ছিল। আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনাও করেছি। কিন্তু এখন আর দুটি বিষয়কে এক করে দেখতে চাই না। আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যখন একসঙ্গে কাজ করি, তখনই ফুটবল সবচেয়ে শক্তিশালী হয়।’

শেখ সালমান আরও জানান, সম্প্রতি জুরিখে ইনফান্তিনোর সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে এবং সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে একটি সুন্দর বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

শুধুমাত্র শেখ সালমানই নন, তাকেও পাল্টা সমর্থন জানিয়েছেন ইনফান্তিনো। আগামী বছর এএফসি সভাপতি হিসেবে চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব পেতে চাওয়া শেখ সালমানের প্রার্থিতাকে সমর্থন দিয়েছেন ফিফা সভাপতি। তার মতে, গত ১৩ বছরে এশিয়ার ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন শেখ সালমান।

ফিফা সভাপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে এএফসির এই অবস্থান পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সংস্থাটির মোট ৪৭টি সদস্য দেশের মধ্যে ৪৬টির ফিফা নির্বাচনে ভোটাধিকার রয়েছে। তবে এএফসি সভাপতির সমর্থন মানেই সব সদস্য ইনফান্তিনোকে ভোট দেবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। যদিও শেখ সালমানের বিশ্বাস, এশিয়ার অধিকাংশ সদস্যই বর্তমান ফিফা সভাপতিকে সমর্থন করবেন।

অন্যদিকে, জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুনেয়াসু মিয়ামোতো জানিয়েছেন, তারা এএফসির অবস্থানের সঙ্গে মিল রেখে এগোতে চান। তবে ইনফান্তিনোকে সমর্থনের বিষয়ে জাপান এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। তার মতে, এশিয়ার সব ফুটবল সংস্থা এই বিষয়ে একমত নয়।

সমর্থন ঘোষণার পর ইনফান্তিনোও তার বক্তব্য পেশ করেন। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ফিফা সভাপতি বলেন, ‘অনেক কাজ করলে কিছু ভুলও হয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া, ক্ষমা চাওয়া এবং সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া।’

এর পাশাপাশি সদস্য দেশগুলোর জন্য ফিফার আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও জানান ইনফান্তিনো। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতিটি সদস্য সংস্থা সর্বোচ্চ ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার পর্যন্ত সহায়তা পেতে পারে। ফুটবল উন্নয়নে মোট তহবিল ৬৩৫ কোটি ডলারে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে এই প্রস্তাবের বিস্তারিত শর্তাবলি এবং চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো বাকি।

২০২৭ সালের ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে ফিফা সভাপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে মনোনয়ন জমা দেওয়ার কথা। এখন পর্যন্ত ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে কোনো প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন জমা পড়েনি। তবে সাবেক সুইস ফুটবলার রামোন ভেগা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আনুষ্ঠানিক প্রার্থী হতে হলে তার অন্তত পাঁচটি জাতীয় ফুটবল সংস্থার সমর্থন প্রয়োজন হবে।