ইসলামি সমাজব্যবস্থায় উপহার আদান-প্রদান একটি অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর রীতি হিসেবে স্বীকৃত। পারস্পরিক হৃদ্যতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই প্রথাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। এই বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর উপহার দাও, এতে ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৫৯৪)
তবে ইসলামে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে হালাল-হারাম এবং ইনসাফের এক সুস্পষ্ট সীমারেখা বিদ্যমান। সব ধরনের উপহার আদান-প্রদান ইসলাম সমর্থন করে না। বিশেষ করে যখন উপহারের মোড়কে ঘুষ, সুদ কিংবা কোনো অন্যায়ের লেনদেন ঘটে, তখন তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) এ ধরনের লেনদেনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
বিশেষ করে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ হিসেবে গণ্য। এই ধরনের উপহার মূলত ঘুষেরই একটি রূপ। বিচারকদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। তাঁদের পদের কারণে যে উপহার দেওয়া হয়, তা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের আত্মসাতের শামিল।
এই বিষয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ করা যায়। একবার মহানবী (সা.) ইবনে লুতবিয়া নামের এক সাহাবিকে জাকাত আদায়ের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে কিছু সম্পদ নিজের কাছে রেখে দাবি করেন, ‘এগুলো আপনাদের, আর এগুলো আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে।’
তার এই কথা শুনে মহানবী (সা.) অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং বলেন, ‘সে তার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকল না কেন? তখন সে দেখত, তাকে কেউ উপহার দেয় কি না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৯৭)
মোল্লা আলী কারি এই প্রসঙ্গে লিখেছেন, “বিচারকদের দেওয়া উপহার মূলত তাঁদের পদের কারণে দেওয়া হয়; তাই পদস্থ অবস্থায় এমন উপঢৌকন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং তা রাষ্ট্রীয় সম্পদের আত্মসাতের (গুলুল) অন্তর্ভুক্ত।” (মোল্লা আলী কারি, মিরকাতুল মাফাতিহ শরহু মিশকাতিল মাসাবিহ, ৬/২৩৪৫, দারুল ফিকর, বৈরুত, ২০০২)
অন্যদিকে, কারও চাকরি পাওয়া, বিপদ থেকে মুক্তি বা কোনো বৈধ কাজে সুপারিশ করা একটি মহৎ কাজ হিসেবে বিবেচিত। তবে এই উপকারের বিনিময়ে কোনো উপহার গ্রহণ করা ইসলামে নিষিদ্ধ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কোনো সুপারিশ করল, এরপর সে তাকে উপহার দিল এবং সে তা গ্রহণ করল, তবে সে সুদের একটি বড় দরজায় উপস্থিত হলো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১)
এর অর্থ হলো, নিঃস্বার্থভাবে উপকার করার পর যদি কেউ উপহার গ্রহণ করে, তবে তা সুদের মতো মহাপাপে পরিণত হয়। একইভাবে ঋণের ক্ষেত্রেও বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। যখন কেউ কাউকে ঋণ দেয়, তখন ঋণগ্রহীতা যদি ঋণদাতাকে কোনো উপহার দেয় অথবা নিজের বাহনে চড়তে দেয়, তবে ঋণদাতার উচিত তা গ্রহণ না করা। কারণ বিপদে মানুষকে ঋণ দেওয়া সওয়াবের কাজ হলেও, এর বিনিময়ে অতিরিক্ত সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করা সুদের পর্যায়ভুক্ত।
এই বিষয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ কাউকে ঋণ দেয়, এরপর ঋণগ্রহীতা যদি তাকে কিছু উপহার দেয় অথবা নিজের বাহনে চড়তে দেয়, তবে সে যেন তা গ্রহণ না করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২)
তবে উল্লেখ্য যে, যদি আগে থেকেই দুই ব্যক্তির মধ্যে স্বাভাবিক উপহার বিনিময়ের সম্পর্ক থেকে থাকে, তবে তা ভিন্ন কথা।
পারিবারিক ক্ষেত্রেও ইনসাফ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সন্তানদের জন্য উপহার দেওয়ার সময় পিতা-মাতার উচিত সমতা বজায় রাখা। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া এক সন্তানকে দামি উপহার দিয়ে অন্যজনকে বঞ্চিত করা ইসলামি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। সাহাবি নোমান ইবনে বশিরকে তাঁর পিতা একটি দাস উপহার দিলে মহানবী (সা.) তা অনুমোদন করেননি। তিনি পিতাকে নির্দেশ দেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমার সন্তানদের মধ্যে ইনসাফ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৮৭)
সন্তানদের মধ্যে এমন বৈষম্যমূলক আচরণ নবীজি স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন, কারণ এটি ভাইবোনদের মধ্যে হিংসা ও মনকষাকষির জন্ম দেয়।
পরিশেষে বলা যায়, উপহার হলো সম্প্রীতির প্রতীক। কিন্তু যখনই এই উপহারের মধ্যে জাগতিক স্বার্থ, পদের অপব্যবহার, সুদ বা বৈষম্য ঢুকে পড়ে, তখন তা আর উপহার থাকে না; বরং তা পরিণত হয় সামাজিক ব্যাধিতে। যেভাবে দায়িত্বশীলদের উপহার নেওয়া নিষিদ্ধ, তেমনি অন্যায় স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে তাঁদের উপহার দেওয়াও নিষিদ্ধ। এটি মূলত মোড়কবদ্ধ ঘুষ। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপরই আল্লাহর অভিশাপ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৩৭)
শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি লিখেছেন, “শাসক বা বিচারকদের উপঢৌকন দেওয়ার প্রথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচার ও বৈষম্য তৈরি করে; যে সমাজে এই প্রথা স্বাভাবিক রূপ নেয়, সেখানে মজলুমের অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয় এবং সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।” (দেহলভি, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২/১৩৪, কাদিমি কুতুবখানা, করাচি, ১৯৮৬)
একজন মুমিন হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো, উপহার আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে নবীজির দেওয়া এই সুস্পষ্ট সীমারেখা মেনে চলা এবং সমাজকে অন্যায় ও বৈষম্যমুক্ত রাখা।