মাদারীপুরের নয়াচর ও চরমুগরিয়া এলাকায় একসময় দল বেঁধে গাছের ডালে ডালে ঘুরে বেড়াত বানর। তবে দীর্ঘ ১৬ মাস ধরে সরকারি খাদ্য বরাদ্দ বন্ধ থাকায় চরম খাদ্যসংকটে পড়েছে প্রায় এক হাজার বানর। ক্ষুধার তাড়নায় এই বন্যপ্রাণীরা এখন নিয়মিত লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দারা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বাসাবাড়ি ও রান্নাঘরে খাবারের সন্ধান করা থেকে শুরু করে মানুষের হাত থেকে খাবার ছিনিয়ে নেওয়ার মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কেবল খাদ্যসংকটই নয়, বরং জনবসতির বিস্তার এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসায় বানরগুলো ক্রমেই লোকালয়মুখী হচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে মানুষ ও বানরের মধ্যে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে বানরগুলোর নিরাপদ আবাসস্থল এবং তাদের অস্তিত্ব নিয়েও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এলাকায়।

১৬ মাস ধরে বন্ধ সরকারি খাদ্য বরাদ্দ

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের জুন মাস থেকে বানরগুলোর জন্য নির্ধারিত সরকারি খাদ্য বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত খাবার না পাওয়ায় ক্ষুধার্ত বানরগুলো খাবারের সন্ধানে মানুষের বসতবাড়িতে ভিড় করছে বলে দাবি স্থানীয়দের।

এক সময় নয়াচর ও চরমুগরিয়া এলাকায় বানরের স্বাভাবিক বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বর্তমানে তাদের উপস্থিতি আগের তুলনায় কমে এসেছে বলে দাবি করেন বাসিন্দারা। খাদ্যসংকট, ক্রমবর্ধমান জনবসতি এবং প্রাকৃতিক বনভূমি বা আবাসস্থল সংকুচিত হওয়াকে তারা এই পরিস্থিতির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

স্থানীয়দের মতে, বানরগুলোকে কেবল লোকালয়ে প্রবেশের কারণে তাড়িয়ে দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং মানুষ ও বানরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

ক্ষুধার তাড়নায় বাসাবাড়িতে হানা

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, খাবারের সন্ধানে বানরের দল প্রায়ই বসতবাড়িতে ঢুকে পড়ে। তারা রান্নাঘর, বারান্দা ও ঘরের বিভিন্ন স্থানে খাবারের খোঁজ করে। অনেক সময় খাবার নিয়ে পালিয়ে যায়, আবার কখনো ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে দেয়। এতে বাসিন্দাদের মধ্যে বিরক্তি ও উদ্বেগের সৃষ্টি হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আকলিমা বলেন, “আগে বানরগুলো গাছপালার মধ্যে থাকত। এখন খাবারের জন্য প্রায়ই বাড়িতে চলে আসে। ঘরে খাবার রাখলেও নিরাপদে রাখা যায় না।” তিনি আরও বলেন, “বানরগুলো খাবার পাক, আবার মানুষেরও যেন স্বাভাবিকভাবে বসবাস করতে সমস্যা না হয়।”

আরেক বাসিন্দা জাকির শেখ বলেন, “বানরগুলো কথা বলতে পারে না। ক্ষুধার কারণে খাবারের সন্ধানে মানুষের কাছে আসছে। তাদের খাবারের ব্যবস্থা না থাকলে এভাবে লোকালয়ে আসতেই থাকবে। এতে মানুষ ও বানর—দুই পক্ষেরই ক্ষতি হচ্ছে।”

ব্যক্তিগত উদ্যোগে খাবার, তবু কাটছে না সংকট

সরকারি বরাদ্দ বন্ধ থাকলেও এলাকার কয়েকজন পশুপ্রেমী নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বানরগুলোকে খাবার দিয়ে আসছেন। তবে প্রায় এক হাজার বানরের বিশাল দলের জন্য ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিয়মিত খাবার জোগাড় করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে খাবার দেওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় পশুপ্রেমী সাব্বির হোসেন বলেন, “আমি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করি কিছু না কিছু খাবার বানরকে দিতে। কিন্তু আমার তেমন টাকা নেই। অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি বানর ও অন্যান্য পশুপাখিকে খাবার দিই। সরকার যদি তাদের খাবারের ব্যবস্থা করত, তাহলে তারা মানুষের বাড়িতে গিয়ে বিরক্ত করত না।”

আরেক পশুপ্রেমী নাজনীন আক্তার বলেন, “বিচ্ছিন্নভাবে খাবার দেওয়ার কারণে বানরগুলোর দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যসংকট দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত ও পরিকল্পিতভাবে খাবার সরবরাহ নিশ্চিত না হলে লোকালয়ে বানরের প্রবেশ আরও বাড়তে পারে।”

স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, “অনেকে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার দিচ্ছেন। কিন্তু এতগুলো বানরের খাবার ব্যক্তিগতভাবে জোগাড় করা সম্ভব নয়। সরকারি উদ্যোগে নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা করা হলে বানরগুলোর বেঁচে থাকা সহজ হবে, পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তিও কমবে।”

বরাদ্দ চেয়েও মেলেনি সমাধান

সামাজিক বন বিভাগের কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জানান, বানরগুলোর খাবারের জন্য বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তবে এখনও সেই বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। ফলে সরকারি উদ্যোগে খাবার সরবরাহ পুনরায় চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সরকারি খাদ্য বরাদ্দ চালু করার পাশাপাশি বানরগুলোর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ এবং মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।