রাজস্ব খাতের সংস্কার প্রক্রিয়ায় বর্তমানে গতি এসেছে। এই সংস্কার উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো—জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও আদায়—এই দুটি কাজকে আলাদা আলাদা বিভাগে বিভক্ত করা; একক মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট হার নির্ধারণ এবং শুল্ক ও কর ছাড়ের পরিমাণ কমিয়ে আনা ইত্যাদি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্ববর্তী ঋণ কর্মসূচির জন্য এই সংস্কারগুলো শর্ত হিসেবে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ আগের সেই ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে।
দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানাচ্ছে যে, গত দুই থেকে তিন মাস ধরে এই আলোচনা প্রক্রিয়া চলছে। নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও আইএমএফ একই ধরনের শর্তাবলি যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা করছে। এই নতুন কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক পর্যায়ে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণের বিষয়ে আলোচনা চলছে, যার মেয়াদ হবে তিন বছর।
গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক যৌথ সভার সাইডলাইন বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আইএমএফ কর্মকর্তাদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এই বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে মূলত রাজস্ব খাতের সংস্কার উদ্যোগগুলোর বর্তমান অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
আইএমএফের দেওয়া শর্তগুলোর অন্যতম প্রধান দাবি হলো—জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও আদায়—এই দুইটিকে আলাদা বিভাগে রূপান্তর করা; একক মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট নির্ধারণ এবং শুল্ক–কর কর ছাড় কমিয়ে আনা ইত্যাদি।
পুরোনো ঋণ কর্মসূচির শর্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এনবিআর বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও আদায় বিভাগ আলাদা করার কথা ছিল। পরিকল্পনাটি ছিল এমন যে, সরকারের একটি নির্দিষ্ট বিভাগ শুল্ক ও করসংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন করবে এবং মাঠপর্যায়ে আরেকটি বিভাগ রাজস্ব আদায়ের কাজ করবে। বর্তমানে এনবিআর এই দুটি কাজই এককভাবে পরিচালনা করছে।
যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এই বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তবে বর্তমান সরকার তা এখনো আইনে পরিণত করেনি। বর্তমান সরকার বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে। ইতিমধ্যে সেই কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
আইএমএফ দীর্ঘ সময় ধরে একক ভ্যাট হার নির্ধারণের কথা বলে আসছে। জানা গেছে, ব্যাংককের বৈঠকেও এই বিষয়ে বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে আইএমএফ।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, একাধিক ভ্যাট হার পরিহার করে একক ভ্যাট হারে যাওয়ার লক্ষ্যে এনবিআর একটি সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে হ্রাসকৃত ভ্যাট হারগুলো পর্যায়ক্রমে তুলে দেওয়া হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে একক ভ্যাট হার কার্যকর করতে চায় এনবিআর। আইন অনুযায়ী এই একক ভ্যাট হার হবে ১৫ শতাংশ। তবে এই হার কমানোর বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা সাড়ে ৭ শতাংশ পর্যন্ত একক ভ্যাট হারের পক্ষে মত দিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে ভ্যাটের হার মূলত ১০টি স্তরে বিভক্ত। এগুলো হলো ১৫, ১০, ৭.৫, ৫, ৪.৫, ৪, ২.৪, ২, ১.৫ ও ০ শতাংশ। তবে অধিকাংশ পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ নির্ধারিত।
আইএমএফের আগের ঋণের শর্ত ছিল ২০২৭ সালের জুলাইয়ের মধ্যে যৌক্তিকভাবে সব ধরনের কর ছাড় বাতিল করা। নতুন ঋণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। তবে এনবিআরের অবস্থান হলো, দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের স্বার্থে সব ধরনের কর ছাড় পুরোপুরি উঠিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে রাজস্ব খাতের অটোমেশনের বিষয়ে আইএমএফের শর্তের সঙ্গে এনবিআর একমত পোষণ করেছে।
দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘকাল ধরে রাজস্ব খাতের সংস্কারের কথা বলে আসছেন এবং দাতারাও একই দাবি জানিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কম কর–জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর একটি, যেখানে এই হার মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গত কয়েক বছরে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি।
খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কেবল আইএমএফের শর্তের কথা নয়, বরং অর্থের জোগানের প্রয়োজনীয়তার কারণেই এনবিআর-কে সংস্কার করতে হবে। আর এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন সম্প্রতি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কর ছাড় কমানো, নীতি ও আদায় কার্যক্রম আলাদা করাসহ রাজস্ব খাতে সংস্কার লাগবেই। আগের ঋণ কর্মসূচির মতো এবারও আইএমএফের একই শর্ত তাদের অবস্থানের পরিবর্তন তো হবে না।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, দেশের বিশেষজ্ঞরা একই ধরনের সংস্কারের অগ্রাধিকারের কথা বলেছেন এবং এই সংস্কারগুলো যত দ্রুত করা যায়, ততই ভালো।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মনে করেন, সাধারণ মানুষের হয়রানি কমাতে রাজস্ব আদায় ও নীতি—এই দুটিকে আলাদা বিভাগ করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি জানান, বিশ্বের অনেক দেশেই রাজস্ব নীতি ও আদায়—এই দুটি আলাদা সংস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এনবিআর নিজেই একটি বিভাগ হবে। তারা রাজস্ব আদায় করবে। কোনো মাধ্যম ছাড়া সরাসরি মন্ত্রীর দপ্তরে রিপোর্ট করবে। নীতি বিভাগ থেকে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করবে।”