২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানের জন্য বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে এখন চরম উত্তেজনা ও অপেক্ষা। আগামী সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডন প্যালাডিয়ামে আয়োজিত হতে যাচ্ছে এই জমকালো অনুষ্ঠান, যেখানে বিশ্বের সেরা ফুটবল তারকাদের সম্মানিত করা হবে। এবারের আয়োজনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ফুটবলের এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি তার গৌরবের ৭০ বছর পূর্ণ করছে।
তবে এই উৎসবের মাঝেই একটি বিস্ময়কর তথ্যের কথা মনে পড়ে, যা ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে। ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা দুই কিংবদন্তি—ব্রাজিলের পেলে এবং আর্জেন্টিনার দিয়েগো ম্যারাডোনা—তাঁদের অসামান্য ক্যারিয়ার সত্ত্বেও কখনোই প্রতিযোগিতামূলক ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে তাঁর ক্যারিয়ারে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়েছেন। অন্যদিকে, ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার অবিশ্বাস্য নৈপুণ্যের হাত ধরে বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা। অথচ এমন অভাবনীয় সাফল্য সত্ত্বেও তাঁদের কেউই ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কারটি স্পর্শ করতে পারেননি। অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, কেন এই দুই মহাতারকা পুরস্কারটির জন্য বিবেচিত হননি?
এর পেছনে লুকিয়ে ছিল তৎকালীন কঠোর নিয়ম। ১৯৫৬ সালে যখন ফরাসি সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল প্রথম ব্যালন ডি’অর চালু করে, তখন এই পুরস্কারটি শুধুমাত্র ইউরোপে খেলা ইউরোপীয় ফুটবলারদের জন্য নির্ধারিত ছিল। এর অর্থ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট—দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা কিংবা বিশ্বের অন্য যেকোনো প্রান্তের খেলোয়াড়রা মাঠে যতই অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান না কেন, তাঁরা এই পুরস্কারের জন্য যোগ্য বিবেচিত হতেন না।
পেলে তাঁর পেশাদার জীবনের দীর্ঘ সময় ব্রাজিলের ক্লাব সান্তোসে কাটিয়েছেন। ফলে তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই এই পুরস্কারের দৌড়ে অযোগ্য ছিলেন। ম্যারাডোনার ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তিনি বার্সেলোনা ও নাপোলির মতো ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ক্লাবে খেলেছেন ঠিকই, কিন্তু আর্জেন্টিনার নাগরিক হওয়ায় ব্যালন ডি’অরের জন্য তাঁর নাম বিবেচনা করা হয়নি। এমনকি ১৯৮৬ সালে যখন ম্যারাডোনা প্রায় একক প্রচেষ্টায় আর্জেন্টিনাকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন, তখনও তাঁকে ব্যালন ডি’অরের জন্য বিবেচনা করা হয়নি, যা বর্তমান সময়ে অবিশ্বাস্য মনে হয়। একইভাবে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে তিনটি বিশ্বকাপ জেতা পেলের ভাগ্যেও এই পুরস্কার জোটেনি, কারণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন নিয়মাবলি।
অবশেষে ১৯৯৫ সালে ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের নিয়মে এক আমূল পরিবর্তন আনা হয়। ওই বছর থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, ইউরোপীয় ক্লাবের হয়ে খেলা যেকোনো দেশের ফুটবলার এই পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হতে পারবেন। এই নতুন নিয়মের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হন লাইবেরিয়ার স্ট্রাইকার জর্জ উইয়াহ। পিএসজি ও এসি মিলানের হয়ে খেলার সময় তিনি ব্যালন ডি’অর জিতে নতুন নিয়মের অধীনে প্রথম ফুটবলার হিসেবে এই গৌরব অর্জন করেন।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালে এই নিয়ম আরও সম্প্রসারিত করা হয় এবং বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে খেলা ফুটবলারদের জন্য পুরস্কারটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল; পেলে ও ম্যারাডোনা দুজনই ফুটবল মাঠ থেকে অবসর নিয়েছিলেন।
যদিও তাঁরা প্রতিযোগিতামূলক ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি, তবে ফুটবলে তাঁদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অসাধারণ ক্যারিয়ারের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৫ সালে ম্যারাডোনাকে একটি সম্মানসূচক ব্যালন ডি’অর প্রদান করা হয়। একইভাবে ২০১৩ সালের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে পেলেকেও একটি সম্মানসূচক ফিফা ব্যালন ডি’অর দেওয়া হয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এই সম্মাননাগুলো ব্যালন ডি’অরের আনুষ্ঠানিক বিজয়ীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নয়। আর এ কারণেই বিষয়টি ফুটবল ইতিহাসের এক কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায় হয়ে আছে।
বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নেওয়া আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসি আটবার ব্যালন ডি’অর জিতে ইতিহাস গড়েছেন। অন্যদিকে পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এই পুরস্কার জিতেছেন পাঁচবার। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্যকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া এবং কোটি কোটি সমর্থকের চোখে সর্বকালের সেরা হিসেবে গণ্য হওয়া পেলে ও ম্যারাডোনা কখনোই প্রতিযোগিতামূলক ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। সম্ভবত এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, একজন ফুটবলারের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব সব সময় ব্যক্তিগত ট্রফির সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়।