ইন্টারনেটে নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে টানা দ্বিতীয় বছরের মতো বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি উন্নতির স্বাক্ষর রেখেছে বাংলাদেশ। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে এখনো গভীর উদ্বেগ রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক খ্যাতনামা গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের প্রকাশিত ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র ফুটে উঠেছে।

গত বৃহস্পতিবার ফ্রিডম হাউসের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ২০২৫ সালের ১ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত মোট ১২ মাসের সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ফ্রিডম হাউসের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ইন্টারনেটে নাগরিক স্বাধীনতার সূচকে ১০০ নম্বরের মধ্যে এ বছর বাংলাদেশের স্কোর দাঁড়িয়েছে ৫০। এর আগের দুই বছরে এই স্কোর ছিল যথাক্রমে ৪০ ও ৪৫। যদিও টানা দুই বছর ধরে উন্নতির ধারা অব্যাহত রয়েছে, তবে বাংলাদেশের নাগরিকেরা ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো ‘আংশিক স্বাধীন’ হিসেবে বিবেচিত।

প্রতিবেদনে মোট ৩৮টি দেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের এবারের ৫ পয়েন্ট অগ্রগতির মধ্যে ৪ পয়েন্ট এসেছে ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে। আর বাকি ১ পয়েন্ট এসেছে অনলাইন কন্টেন্ট বা আধেয়য়ের ওপর বিধিনিষেধ হ্রাস পাওয়ার কারণে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট স্বাধীনতার সামগ্রিক পরিস্থিতি টানা ১৬তম বছরের মতো হ্রাস পেয়েছে। তবে ২০১৬ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশে পুরো এক বছর কোনো ইন্টারনেট ‘শাটডাউনের’ (ইন্টারনেট পরিষেবা পুরোপুরি বন্ধ) ঘটনা ঘটেনি। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং পরবর্তীতে গৃহীত বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগকে বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্বাধীনতার এই অগ্রগতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ফ্রিডম হাউস।

ফ্রিডম হাউসের এই প্রতিবেদনে বিশ্বের প্রায় ৭১ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ ব্যবহারকারীকে ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ‘মুক্ত নয়’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। ৩১ শতাংশ ব্যবহারকারী রয়েছেন ‘আংশিক মুক্ত’ শ্রেণিতে এবং মাত্র ৯ দশমিক ১ শতাংশ ব্যবহারকারী সম্পূর্ণ মুক্ত ইন্টারনেট পরিবেশে অবস্থান করছেন।

তালিকার শীর্ষে রয়েছে এস্তোনিয়া, যাদের স্কোর ৯১। অন্যদিকে চীন, ইরান ও মিয়ানমার মাত্র ৯ স্কোর নিয়ে তালিকার একেবারে নিচে অবস্থান করছে। এছাড়া রাশিয়ার স্কোর ১৬, পাকিস্তানের ২৭ এবং ভারতের স্কোর ৫০।

প্রতিবেদনের মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো দেশের স্কোর ৭০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকলে সেটিকে ইন্টারনেটে ‘স্বাধীন’, ৪০ থেকে ৬৯-এর মধ্যে থাকলে ‘আংশিক স্বাধীন’ এবং ০ থেকে ৩৯-এর মধ্যে থাকলে সেই দেশটিকে ‘স্বাধীন নয়’ বলে গণ্য করা হয়।

ফ্রিডম হাউস তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী দলের সমাবেশ ও আন্দোলনের সময় প্রায়ই ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হতো। এমনকি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়েও ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল। এসব পদক্ষেপের কারণে দেশটির ইন্টারনেট স্বাধীনতার পরিধি সংকুচিত হয়েছিল।

ইন্টারনেট স্বাধীনতার উন্নতি হলেও সাংবাদিকদের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফ্রিডম হাউস। প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত বাংলাদেশের ২৮০ জনের বেশি সাংবাদিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগে মামলার সম্মুখীন হয়েছেন। এই তালিকায় অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিকেরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।

উল্লেখযোগ্য যে, এসব মামলার অধিকাংশই ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান সংক্রান্ত সংবাদ পরিবেশনের সাথে সম্পর্কিত। ওই সংবাদগুলোকে আওয়ামী লীগের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুক্তকণ্ঠ ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার ঘটনাটিও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও স্বাধীন এ দুই সংবাদমাধ্যমকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতপন্থী বলে প্রচার করা হয়। এরপর একদল মানুষ সংবাদমাধ্যম দুটির কার্যালয়ে হামলা চালায় এবং ভবনে আগুন দেয়। এতে সেখানে কর্মরত সাংবাদিকেরা চরম বিপদের মুখে পড়েন। ফ্রিডম হাউস এই ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করেছে।

পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপ করা বিধিনিষেধের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কখনো কখনো আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই দমনমূলক কৌশল ব্যবহার করেছে।

নতুন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেট স্বাধীনতার অগ্রগতি দেখিয়েছে, কীভাবে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের ডিজিটাল দমন-পীড়নের অবসান ঘটিয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

ফ্রিডম হাউসের মতে, গণ–আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। তবে এই অর্জিত অগ্রগতি ধরে রাখা এবং একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।