যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে আবারও শান্তি আলোচনায় বসতে সম্মত হয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আগামী মাস থেকেই এই আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার ক্রেমলিন থেকে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এর আগে মস্কোতে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী এই সংঘাত অবসানের লক্ষ্যে ওয়াশিংটনের নেওয়া নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি রাজকীয় প্রাসাদে আয়োজিত এই বৈঠকটি ছিল পুতিন ও উইটকফের মধ্যে নবম সরাসরি সাক্ষাৎ। আলোচনার শুরুতে সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক স্টিফেন হাবার্ডকে মুক্তি দেয়। রাশিয়ায় আটক হাবার্ডকে মুক্তি দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পুতিনের কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

এমন এক সময়ে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো, যখন ইউক্রেন এবং দেশটির মিত্র দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইউক্রেনের পাশে থাকা থেকে সরে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে যে, রাশিয়ার হামলা সম্পর্কে তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্য প্রদান মাঝেমধ্যে বন্ধ রাখা হচ্ছে এবং ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় গেলে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে দেবেন। তবে সেই প্রতিশ্রুতির দুই বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও যুদ্ধ থামেনি। এখন নতুন করে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

ক্রেমলিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই নতুন ত্রিপক্ষীয় আলোচনা কারিগরি পর্যায়ে হতে পারে। যুদ্ধ অবসানের পর ইউক্রেন ও রাশিয়ার নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলাপ হবে। আগামী ১০ নভেম্বর বা তার পরবর্তী সময়ে এই বৈঠক শুরু হতে পারে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সর্বশেষ শান্তি আলোচনা হয়েছিল ফেব্রুয়ারিতে, যার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে।

তবে উইটকফের সঙ্গে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় দেশ এবং ন্যাটোর প্রতিনিধিদের বৈঠক নিয়ে ক্রেমলিন খুব একটা আশাবাদী নয়। উইটকফ পুতিনকে জানিয়েছেন যে, ওই আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউক্রেন নতুন কিছু ধারণা ও প্রস্তাব পেশ করেছে।

শান্তিচুক্তির শর্তাবলী নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেনের অবস্থানের মধ্যে এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। তবে ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনের ওপর সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য চাপ বাড়িয়েছেন। গত মঙ্গলবার তিনি বলেন, “ইউক্রেনের এখন যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে। না হলে দেশটির জন্য ‘খুব খারাপ কিছু’ অপেক্ষা করছে।”

সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক চলার পর ক্রেমলিনের কর্মকর্তা ইউরি উশাকভ সাংবাদিকদের বলেন, “এ সূক্ষ্ম বিষয়গুলো, বলতে গেলে আমাদের পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারেনি।”

শান্তিচুক্তির শর্ত নিয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেন এখনো অনেক দূরে অবস্থান করছে। তবে ট্রাম্প সম্প্রতি ইউক্রেনের ওপর সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য চাপ বাড়িয়েছেন। গত মঙ্গলবার তিনি বলেন, “ইউক্রেনের এখন যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে। না হলে দেশটির জন্য ‘খুব খারাপ কিছু’ অপেক্ষা করছে।”

গতকালের বৈঠকে পুতিন ইরান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পকে সহায়তা করার প্রস্তাবও দিয়েছেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, পুতিন উইটকফকে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার কয়েক দশকের সম্পর্ক। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে মস্কো এই সম্পর্ক কাজে লাগানোর প্রস্তাব আগেও দিয়েছে। ক্রেমলিনের ভাষ্য অনুযায়ী, পুতিন বলেছেন, “তেহরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব এবং তা প্রয়োজনও।”

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকদের সহায়তার জন্য রাশিয়া বিপুল পরিমাণ সার সরবরাহ করতে পারে বলে উইটকফকে জানিয়েছেন পুতিন।

আগামী মাসে চীনে ট্রাম্প ও দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠক নিয়েও গতকালের আলোচনায় কথা হয়েছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বেইজিং ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছে। তাদের দাবি, এ ধরনের বৈঠক ইতিহাসে প্রথমবার হতে যাচ্ছে।

তবে পুতিন যুদ্ধের মূল লক্ষ্যগুলো থেকে সরে আসার তেমন কোনো ইঙ্গিত দেননি। এসব লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ রাশিয়ার হাতে নেওয়া, ইউক্রেনকে ন্যাটোর সদস্য হতে না দেওয়া এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির বদলে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি করা।

উইটকফের সঙ্গে বৈঠকে পুতিনের বিশেষ বিনিয়োগবিষয়ক দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভও উপস্থিত ছিলেন। ক্রেমলিন জানিয়েছে, বৈঠকে বড় ধরনের যৌথ অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাছাকাছি পর্যায়ে রয়েছে।

উইটকফ জানান, সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে বিভিন্ন ধারণা-সংবলিত কিছু নথি তিনি পুতিনের পর্যালোচনার জন্য নিয়ে এসেছেন। ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও পুতিনের কাছে কিছু ধারণা তুলে ধরতে চান। পরে ফোনের মাধ্যমে তিনিও বৈঠকে যুক্ত হন।

এদিকে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুদ্ধ কীভাবে শেষ করা যায়, সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে আলোচনা করতে চান তিনি। তবে ক্রেমলিন বারবার বলেছে, পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠক হলে তা ফলপ্রসূ করতে আগে থেকেই দুই নেতার সহযোগীদের বিস্তারিত প্রস্তুতি নিতে হবে।