একবার আমাদের বিমানটি হিথরোর পরিবর্তে এয়ার ট্রাফিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় গ্যাটউইকে অবতরণ করেছিল। পরে জানা গেল, হিথ্রো বিমানবন্দরে লাগেজ ওঠানো-নামানোর কাজে নিয়োজিত কর্মীরা কর্মবিরতি পালন করছেন। তাঁদের এই আন্দোলনে ইউরোপের আরও বেশ কিছু বিমানবন্দরের কর্মীরা শামিল হন। তাঁদের মূল দাবি ছিল, লাগেজের ব্যাগের ওজন কমিয়ে আনতে হবে।

বিমানবন্দরের ব্যাগেজ কর্মীদের প্রতিনিয়ত স্যুটকেস তোলা, নামানো, ঠেলে নেওয়া এবং বেল্টে স্থাপন করতে হয়। যদি কোনো ব্যাগ অতিরিক্ত ভারী হয়, তবে কর্মীদের কোমর, কাঁধ ও হাতে আঘাত পাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে অস্ট্রেলিয়ান এভিয়েশন গ্রাউন্ড সেফটি কাউন্সিলের সদস্যরা একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন যে, একটি ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন হবে ৩২ কেজি। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাগের ওজন কমানোর ফলে ব্যাগেজ হ্যান্ডলিংজনিত আঘাতের সংখ্যা ১৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ১ জুন দোহা বিমানবন্দর সব এয়ারলাইনের জন্য একটি অভিন্ন মানদণ্ড চালু করে। তারা ঘোষণা করে যে, কোনো ব্যাগের ওজনই ৩২ কেজির সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।

পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠান ব্যাগের ওজন ৩২ কেজি থেকে আরও কমিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এই বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টের আলোচনায় চলে আসে এবং চূড়ান্তভাবে ২৩ কেজি ওজনের ব্যাগ গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা কর্মজীবী ঘোড়া, গাধা ও খচ্চরের কাজের চাপ নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রাণীর শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং আবহাওয়ার মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেয়। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় যুক্তরাজ্যে সুস্থ গাধার ক্ষেত্রে ৫০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহনের সুপারিশ করা হয়েছে। বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বহনযোগ্য ওজন নির্ধারণের সময় প্রাণীটির নিজস্ব ওজন, বয়স ও শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যেমন—পিঠের দুই পাশে মাল সমানভাবে ভাগ করে দিতে হবে এবং উপযুক্ত প্যাড বা জিন ব্যবহার করতে হবে।

পাশাপাশি কত দূরত্ব, কতক্ষণ এবং কী ধরনের রাস্তায় চলতে হবে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানির ব্যবস্থা এবং গরম আবহাওয়ার প্রভাবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি পিঠে ঘা, খোঁড়ানো, অতিরিক্ত হাঁপানো বা চলতে অনীহা দেখা দেয়, তবে বোঝা কমাতে হবে অথবা কাজ পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে।

কিন্তু আমাদের দেশের শিশুদের জন্য কোনো লাগেজ বা ব্যাগেজ রুল নেই। বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, শিশুরা নিয়মিত অতিরিক্ত ভারী স্কুলব্যাগ বহন করলে তাদের ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা ও অস্বস্তি হতে পারে। বিশেষ করে ব্যাগটি যদি শিশুর শরীরের ওজনের তুলনায় বেশি ভারী হয় অথবা কেবল এক কাঁধে ঝোলানো হয়, তবে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যায়।

যেসব দেশ শিশুদের কল্যাণের কথা ভাবে, তারা বলছে শিশুর ব্যাগের ওজন হবে তার শরীরের ওজনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ। তার মানে, স্কুলব্যাগের মোট ওজন শিশুর শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে। যেমন শিশুর ওজন যদি ২০ কেজি হয়, তাহলে তার ব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন হবে ২ কেজি। ব্যাগের ওজন শরীরের ওজনের ১৫ শতাংশ বা তার বেশি হলে সেটিকে সতর্কতা বা ঝুঁকির সীমা হিসেবে বিবেচনা করা ভালো।

তাহলে বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণিতে পড়ুয়া একটি শিশুর ব্যাগের ওজন কত হওয়া উচিত? প্রথম শ্রেণিতে এখন ভর্তির বয়স ছয় বছর। আমাদের দেশে এই বয়সী শিশুদের গড় ওজন নিয়ে গবেষণানির্ভর কোনো তথ্যতালিকা লেখকের নজরে পড়েনি। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৭ সালের ৫-১০ বছর বয়সী শিশুদের বৃদ্ধির মানদণ্ড অনুযায়ী, ঠিক ছয় বছর বয়সে ছেলেদের ওজনের মধ্যম মান ২০ দশমিক ৫ কেজি এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ২০ দশমিক ২ কেজি।

মালিবাগের এক নামকরা স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে অনিক। তার মাকে ফোন করে লেখক জানতে চান, অনিকের স্কুলব্যাগের ওজন কত? মা উত্তর দেন, “ওর স্কুলব্যাগ অনেক ভারী, মামা।” লেখক প্রশ্ন করেন, “কেমনে বুঝলা?” মা বলেন, “আমি টানি, আমি বুঝব না?” অনিকের ওজন ৪০ কেজি। সেই হিসাবে তার ব্যাগের ওজন হওয়া উচিত চার কেজির বেশি নয়। অথচ তার ব্যাগের ওজন প্রায় এর দ্বিগুণ। অনিকের মা তাঁদের বাড়ির ওজন মাপার যন্ত্রে ব্যাগটির ওজন করে হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠিয়ে দিয়েছেন।

তবে মনে রাখা ভালো, এগুলো বাংলাদেশের শিশুদের ওপর করা পৃথক কোনো জাতীয় জরিপের গড় নয়। এরপরও বাংলাদেশি ছয় বছর বয়সী শিশুর গড় ওজনের ব্যবহারিক হিসাব হিসেবে প্রায় ২০ কেজি ধরা যায়। তবে ছেলে ও মেয়ের ওজনে সামান্য পার্থক্য থাকবেই।

লেখকের এক প্রতিবেশীর নাতনি সদ্য স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে। তার ব্যাগটি কখনো বহন করেন ড্রাইভার আঙ্কেল, কখনো স্কুলের খালারাই বহন করেন। ব্যাগটি সে শুধু কাছে পায় স্কুলে। ব্যাগের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা পুতুল ‘টেড’-কে সে খুব মিস করে। লেখক ব্যাগটি হাতে নিয়ে দেখেন, ওজন ১০ কেজির কম নয়। এটি তার শরীরের ওজনের প্রায় ৫০ শতাংশ। অথচ হওয়া উচিত ছিল ১০ শতাংশ।

ডব্লিউএইচওর বাইরে অন্যান্য সংস্থাও স্কুলব্যাগের অতিরিক্ত ওজন নিয়ে চিন্তিত। আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের (এএপি) শিশুনিরাপত্তা নির্দেশনায় ব্যাগের ওজন শিশুর শরীরের ওজনের ১৫ শতাংশের বেশি না রাখার কথা বলা হয়েছে। আরও সতর্কতার জন্য ১০ শতাংশ বা তার কম রাখাকে ভালো লক্ষ্য হিসেবে ধরা যায়।

ব্যাগের ওজন ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাগটি কীভাবে বহন করা হচ্ছে। এএপি বলছে, দুই কাঁধে চওড়া ও প্যাডযুক্ত স্ট্র্যাপ ব্যবহার করতে হবে, ব্যাগটি পিঠের কাছাকাছি রাখতে হবে এবং সবচেয়ে ভারী বইগুলো শরীরের সবচেয়ে কাছে রাখতে হবে। শিশু যদি ব্যাগ নিয়ে হাঁটার সময় সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, কাঁধ বা ঘাড়ে ব্যথা অনুভব করে কিংবা ব্যাগ তুলতে কষ্ট হয়, তাহলে ওজন নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকলেও সেটি তার জন্য বেশি ভারী হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবহারযোগ্য করে একটি চার্ট সাজানো যেতে পারে, যেখানে শিশুর নিজের ওজনের ১০ শতাংশকে আদর্শ বা লক্ষ্যমাত্রা এবং ১৫ শতাংশকে সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে ধরা হবে। শিশুদের স্কুলব্যাগ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় ১০ শতাংশ সীমার পক্ষে যথেষ্ট সমর্থন রয়েছে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি রায়েও ১০ শতাংশ সীমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৫ সালের ৮২৫২ নম্বর রিট পিটিশনের রায় দেওয়া হয় ২০১৬ সালের ৭ ডিসেম্বর। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস এই রায় দেন। রায়ের ৩ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, “স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর বহন করা স্কুলব্যাগের সর্বোচ্চ ওজন তার শরীরের ওজনের এক-দশমাংশ বা ১০ শতাংশ হওয়া উচিত। এর মধ্যে পানির বোতল, খাবারের বাক্সসহ ব্যাগে থাকা অন্যান্য জিনিসের ওজনও অন্তর্ভুক্ত।”

রায়ের শেষ পৃষ্ঠায় আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ নিষিদ্ধ করে ছয় মাসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেন। আইন প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুন পরিপত্র জারিরও নির্দেশ দেওয়া হয়।

লেখকের প্রার্থনা, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আইন প্রণয়নে আমাদের হিকমত দিন। পরিপত্রটি সর্বত্র পৌঁছে দেওয়ার তৌফিক দান করুন। শিশুরা ভারমুক্ত হোক। আমিন।

— গওহার নঈম ওয়ারা, লেখক, গবেষক ও শিশু অধিকারকর্মী।