একটি তিত বেগুনের চারা ও একটি টমেটোর চারা। এ দুটি চারার নির্দিষ্ট অংশ কেটে নেওয়ার পর একটির সঙ্গে আরেকটি জুড়ে দেওয়া হচ্ছে। নিচে থাকে তিত বেগুনের শক্ত শিকড়, ওপরে টমেটোর অংশ। জোড়ার স্থানটি পলিথিন দিয়ে বেঁধে বিশেষ পরিচর্যায় রাখা হয়। তিন থেকে ছয় দিনের মধ্যে দুটি অংশ জোড়া লাগে। পরে ১০ থেকে ১২ দিন চারাগুলো পরিচর্যার ঘরে রেখে শক্ত করা হয়। এভাবে তৈরি হয় গ্রাফটিং টমেটোর চারা।
এসব গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরি হচ্ছে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে। পরে এসব চারা কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সুনামগঞ্জ, পটুয়াখালী, হবিগঞ্জ, কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।
ক্যাপশন ২: তিত বেগুনের শিকড়ের সঙ্গে টমেটোর অংশ জুড়ে তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং চারা। সম্প্রতি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের আদমপুরে। ছবি: মুক্তকণ্ঠ কমলগঞ্জ কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর, জালালপুর, বনগাঁও, কান্দিগাঁও, মধ্যগাঁও, নাজাতকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকভাবে তৈরি হচ্ছে গ্রাফটিং টমেটোর চারা। এসব এলাকার নার্সারিতে ব্যস্ত সময় পার করেন শ্রমিক ও উদ্যোক্তারা। বছরের সব সময় এসব চারা তৈরি করা হয়। বছরে প্রায় ৬৫ লাখ চারা উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। এসব চারা প্রতিটি ১২ থেকে ১৫ টাকায় বিক্রি হয়। এই চারাকে কেন্দ্র করে উপজেলায় বছরে সাত কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাকিবুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, গ্রাফটিং করা টমেটোগাছ সাধারণ গাছের তুলনায় শক্ত হয় এবং সহজে ঢলে পড়ে না। রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। সাধারণ টমেটোগাছ তিন মাস বাঁচে আর গ্রাফটিং করা টমেটোগাছ আট মাস বাঁচে। এসব চারার জীবনকাল বেশি হওয়ায় এর চাহিদা শুধু কমলগঞ্জেই নয়, দেশের বিভিন্ন জেলাতেও ব্যাপক।ক্যাপশন ৩: বিভিন্ন স্থানে চারাগুলো পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। সম্প্রতি কমলগঞ্জের আদমপুরে। ছবি: মুক্তকণ্ঠ
কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রাফটিং পদ্ধতিতে চারা তৈরির জন্য প্রথমে তিত বেগুন বা বনবেগুন ও টমেটোর আলাদা বীজতলা তৈরি করা হয়। তিত বেগুনের চারা উপযুক্ত হতে সময় লাগে প্রায় ৩৫ দিন। টমেটোর চারা তৈরি হতে লাগে প্রায় ২৫ দিন। পরে স্বাস্থ্যবান ও সমান আকারের চারাগুলো বাছাই করে গ্রাফটিং করা হয়। শ্রমিকেরা একটি চারা গ্রাফটিংয়ের জন্য প্রায় এক টাকা করে মজুরি পান। দক্ষতার ওপর নির্ভর করে একজন শ্রমিক দিনে ৭০০ থেকে ১ হাজার ২০০টি পর্যন্ত চারা জোড়া লাগাতে পারেন।
কমলগঞ্জের আরিফ হাইব্রিড টমেটো নার্সারি অ্যান্ড প্রোডাক্টসের মালিক এম এ করিম বলেন, তিনি আগে সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। চাকরি থেকে অবসরের পর সেনাবাহিনীর একটা প্রজেক্টে রংপুরে গিয়ে গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরির কাজ শেখেন। সেখানে দীর্ঘদিন কাজ করার পর কমলগঞ্জে এসে এই চারা উৎপাদনের কাজ শুরু করেন।
এম এ করিম বলেন, ‘শুরুতে এলাকায় এই কাজ খুব বেশি পরিচিত ছিল না। পরে আমার দেখাদেখি অনেক কৃষক এই কাজে যুক্ত হয়েছেন। এখন কমলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাফটিং টমেটোর চারা তৈরি হচ্ছে। আমার নার্সারিতে সপ্তাহে প্রায় ৮০ হাজার চারা তৈরি ও বিক্রি হয়। এখানে প্রায় ৬০ জন শ্রমিক দিন-রাত মিলিয়ে তিন শিফটে কাজ করেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কৃষকেরা এসে চারা কিনে নিয়ে যান।’শ্রমিক সুমন মিয়া গ্রাফটিংয়ের কাজের সঙ্গে নিয়োজিত। তাঁর সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, গ্রাফটিং কাজে প্রতিটি চারার জন্য এক টাকা পান তাঁরা। দৈনিক একেকজন শ্রমিক ১ হাজার ২০০ পর্যন্ত চারা তৈরি করতে পারেন। অন্য কোনো কাজে এত মজুরি পাওয়া যায় না। এ কাজে পরিশ্রমও কম। তাই যিনি একবার এই কাজ শেখেন, তিনি আর এ কাজ ছেড়ে যান না।
কমলগঞ্জ উপজেলার কৃষির একটি বিশেষ দিক হয়ে উঠেছে গ্রাফটিং টমেটো। গ্রাফটিং চারা বানানোর প্রায় ৩০০ নার্সারি আছে কমলগঞ্জে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ ও গ্রাফটিং চারার নার্সারি হয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় হাজারো কৃষক যুক্ত রয়েছেন এবং প্রতিনিয়ত এই সংখ্যা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় চাষিরা।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সম্প্রতি উপজেলায় যোগদানের পর গ্রাফটিং টমেটোর চারা উৎপাদনের বিষয়টি আমার নজরে আসে। আমি কয়েকটি জায়গা পরিদর্শন করেছি। এটি এই এলাকার সম্ভাবনাময় একটি কৃষি খাত। কৃষকেরা যেন আরও ভালোভাবে চারা উৎপাদন করতে পারেন এবং দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা যেন সহজে এসব চারা সংগ্রহ করতে পারেন, সে জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।’