শরীয়তপুরের আংগারিয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির আমানতকারী ও লভ্যাংশভোগীদের দীর্ঘদিনের বকেয়া টাকা ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে এবং নিজেদের অর্থ উদ্ধারের দাবিতে কয়েকশ গ্রাহক তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। অভিযোগ করা হয়েছে যে, ওই সমিতির প্রায় ১০ হাজার গ্রাহকের আনুমানিক ২০ কোটি টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পুলিশ সমিতির চেয়ারম্যান স্বপন হাওলাদারকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে।

গত বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল থেকেই শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়ার বাগচি বাজার এলাকায় অবস্থিত সমিতির কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন গ্রাহকেরা। বিক্ষোভ এক পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করলে তারা সমিতির কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের ভেতরে আটকে ফেলেন।

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, তাদের আমানতের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার দীর্ঘ সময় পার হলেও সমিতির পক্ষ থেকে মূল টাকা ও লভ্যাংশ ফেরত দেওয়া হচ্ছে না। টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় তারা বারবার সমিতির কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন এবং ধরনা দিয়েছেন, কিন্তু কোনো সমাধান মেলেনি। গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, তাদের জমানো টাকা নিয়ে সমিতির কর্মকর্তারা পালিয়ে যেতে পারেন।

বিক্ষোভকারীদের প্রবল চাপের মুখে পালং মডেল থানা-পুলিশ পদক্ষেপ নেয় এবং সমিতির চেয়ারম্যান স্বপন হাওলাদার, নির্বাহী পরিচালক কাকলী আক্তার ও তাদের সহযোগী দিপু মোল্লাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। পুলিশ তাদের থানায় নেওয়ার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে কয়েকশ বিক্ষুব্ধ গ্রাহক থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ শুরু করেন। টাকা ফেরতের দাবিতে তারা টানা কয়েক ঘণ্টা থানার সামনে অবস্থান করেন।

ভুক্তভোগী গ্রাহক সেলিনা বেগম তার কষ্টের কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমার স্বামী ভিক্ষা করে টাকা জমিয়েছেন। সেই টাকা এখানে রেখেছি। এখন আমার স্বামীর অস্ত্রোপচার হবে, কিন্তু তারা টাকা দিচ্ছেন না। আমি আমার টাকা ফেরত চাই।’

আরেক গ্রাহক আলেয়া বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘আমার ছেলেদের ভবিষ্যতের জন্য চারটি ডিপোজিট করেছি। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি টাকাও পাইনি। তারা টাকা নেওয়ার সময় অনেক মিষ্টি কথা বলেন, কিন্তু ফেরত চাইলে টাকা দেন না, উল্টো খারাপ ব্যবহার করেন।’

এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে সমিতির চেয়ারম্যান স্বপন হাওলাদার দাবি করেন, তাদের সমিতির কয়েকজন কর্মচারী আর্থিক অনিয়মে লিপ্ত ছিলেন, যার ফলে কয়েকজনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তার দাবি, ওই বহিষ্কৃত কর্মচারীরাই চক্রান্ত করে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করেছেন এবং বলেছেন যে কর্মকর্তারা টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবেন। এই প্ররোচনার কারণেই গ্রাহকেরা একসঙ্গে টাকা ফেরত চাইতে এসেছেন বলে তিনি জানান।

তিনি আরও দাবি করেন, কোনো গ্রাহকের টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে নেই। তারা আগেও টাকা পরিশোধ করেছেন, বর্তমানেও করছেন এবং ভবিষ্যতেও তা করবেন।

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম জানান, স্বপন হাওলাদার গ্রাহকদের টাকা নিয়ে পালিয়ে যেতে পারেন—এমন তথ্যের ভিত্তিতেই গ্রাহকেরা তাকে আটকে রেখেছিলেন। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এরপর গ্রাহকদের প্রতিনিধি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে কয়েক দফায় টাকা পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ওসি আরও জানান, সম্পূর্ণ টাকা ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত চেয়ারম্যান স্বপন হাওলাদারকে পুলিশের জিম্মায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বাকি দুইজনকে টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান যদি টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।