ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল রাখার কৌশলগত লক্ষ্য নিয়ে ভারত সফরে এসেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এই সফরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বুধবার তিনি পশ্চিম ভারতের গুজরাট রাজ্যের জামনগরে পৌঁছান। সেখানে তিনি বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগারটি পরিদর্শন করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত কর্মসূচি পরিবর্তন করে রুবিও রাতে জামনগরেই অবস্থান করবেন।

জামনগরে অবস্থিত এই বিশাল তেল শোধনাগার কমপ্লেক্সটি ভারতের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের মালিকানাধীন। এই পরিদর্শনের পাশাপাশি রিলায়েন্সের কর্ণধার মুকেশ আম্বানি এবং ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করবেন মার্কো রুবিও। ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর এর আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, (জামনগরে) তিনি (রুবিও) রিলায়েন্সের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করবেন।

সফরের প্রথম দিন মঙ্গলবারই ভারতের জ্বালানি সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা জানান মার্কো রুবিও। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। এর আগে তিনি ভারতকে অপরিশোধিত তেল শোধনের ক্ষেত্রে ‘সুপারপাওয়ার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, আগামী নভেম্বরের শুরুতে মার্কিন কংগ্রেসে ‘মিড টার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই সময়ের আগে ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেলের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ন্ত্রণ করা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানির বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করে রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করাও রুবিওর এই সফরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

এছাড়া রিলায়েন্স সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যাকে ট্রাম্প প্রশাসন বৈশ্বিক পুঁজি আকর্ষণে তাদের সফলতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, চলতি বছরের শুরুতে রুবিও ভারতে এলেও এবারের সফরটি ‘একটু বেশি ব্যবসাকেন্দ্রিক’। রুবিওর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আগেই জানানো হয়েছিল যে, তিনি ‘বাণিজ্যিক বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুযোগগুলোকে উৎসাহিত করার জন্য ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে দেখা করবেন।’

যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বৈশ্বিক তেল বাণিজ্যের ধরনে পরিবর্তন আনতে চাইছে। বিশেষ করে চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের পর দেশটির অপরিশোধিত তেলের নিয়ন্ত্রণ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এখন ভেনেজুয়েলার সেই তেল আমদানির ক্ষেত্রে জামনগর শোধনাগারের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে।

মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে রুবিও বলেন, ‘আমরা ভেনেজুয়েলার অপরিশোধিত তেল আরও বেশি করে শোধন করার বিষয়ে রিলায়েন্সের সঙ্গে কথা বলব।’

ভোক্তাপণ্য ও বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরে রিলায়েন্স থেকে প্রতিদিন ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ করা হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন জামনগর শোধনাগারটি এককভাবে বিশ্বের বৃহত্তম তেল শোধনাগার। এর দৈনিক সম্মিলিত অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ক্ষমতা ১৪ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক শোধনাগার ক্ষমতার প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই কমপ্লেক্সে দুটি পৃথক শোধনাগার রয়েছে। প্রথমটি ১৯৯৯ সালে চালু হওয়া মূল সুবিধা, যার ক্ষমতা প্রতিদিন ৬ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল। দ্বিতীয়টি ২০০৮ সালে চালু হওয়া একটি রপ্তানিমুখী শোধনাগার, যা একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিচালিত হয় এবং প্রতিদিন আরও ৫ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াজাত করে।

রিলায়েন্স গত মাসে দাবি করেছে যে, তাদের এই কমপ্লেক্সটি এ পর্যন্ত ২১৬টির বেশি ধরনের অপরিশোধিত গ্রেড প্রক্রিয়াজাত করেছে। সংস্থাটির দাবি, এটি ‘সম্ভবত এই কৃতিত্ব অর্জনকারী একমাত্র শোধনাগার’।