ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে বিজেপি শাসিত মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকার এক ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে। এই অভিযানের আওতায় রাজ্যের বিস্তৃত বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে ৫০০-এর বেশি পরিবার তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, উচ্ছেদ হওয়া এই পরিবারগুলোর অধিকাংশই ছিল বাঙালি মুসলিম।

প্রশাসনের এই কঠোর পদক্ষেপের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দাবি করেছেন যে, রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রশাসন তার ‘রুদ্র রূপ’ প্রদর্শন করেছে। তবে সরকারের এই অবস্থানের বিপরীতে সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে, কারণ লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে মূলত বাঙালি মুসলিমদেরই।

রাজ্য প্রশাসনের দেওয়া সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, আসামের তিনটি জেলায় এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়। গোলাঘাট, হোজাই এবং নগাঁও জেলায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৬৩৮ হেক্টরেরও বেশি সরকারি বনভূমি অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগের সুরক্ষিত জমি রক্ষা করা এবং সেখানে অবৈধভাবে নির্মিত সব ধরনের স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

গত শনি ও রোববার নগাঁও, হোজাই এবং গোলাঘাট জেলায় বন বিভাগ তাদের মূল অভিযানটি সম্পন্ন করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গেছে রোববার নগাঁও জেলার লুতুমাই সংরক্ষিত বনাঞ্চলে। সেখানে মাত্র একদিনের অভিযানে প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়, যার ফলে প্রায় ৫৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তিনটি জেলা মিলিয়ে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের মোট সংখ্যা প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি।

বন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত আগস্ট মাসেই মাইকিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তাদের দাবি, এই আগাম সতর্কবার্তার কারণেই উচ্ছেদ অভিযান শুরুর আগেই প্রায় ৯০ শতাংশ কথিত দখলদার স্বতঃস্ফূর্তভাবে জায়গা খালি করে চলে যান। এছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটি আদালতের নির্দেশ মেনেই সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে ভিন্ন কথা বলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ১ হাজার ১০০-এর বেশি পরিবারকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার পাশাপাশি বেশ কয়েকটি মসজিদও ভেঙে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এই অভিযানের তীব্র নিন্দা ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন নামক একটি সংগঠন উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় চরম পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, “গত রোববারের অভিযানে সহস্রাধিক ঘরবাড়ির পাশাপাশি একাধিক মসজিদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে।” সংগঠনের সভাপতি আরও উল্লেখ করেন যে, লুতুমাই বনাঞ্চল থেকে যেসব পরিবার উচ্ছেদ করা হয়েছে, তাদের একটি বড় অংশকে ১৯৭৩ সালে সরকার সাময়িকভাবে সেখানে পুনর্বাসিত করেছিল।

ওই সংগঠনের আরও অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ থাকলেও উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্টভাবে একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে নিশানা করা হচ্ছে। অথচ অন্য ধর্মাবলম্বী বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এখনো নোটিশ দেওয়ার কাজ শুরু হয়নি। সব মিলিয়ে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার এবং স্থানীয়দের অধিকার দাবির লড়াইয়ে বর্তমানে এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল পরিস্থিতি বিরাজ করছে।