চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সরকারি বনভূমি উদ্ধারে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। আজ বৃহস্পতিবার উপজেলার অ্যাভিয়ারি অ্যান্ড ইকো-পার্ক সংলগ্ন এলাকায় একটি উচ্ছেদ অভিযান চলাকালীন এই ঘটনা ঘটে। বন বিভাগের দাবি, এই ঘটনায় রাঙ্গুনিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহরাজ উদ্দীনসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী আহত হয়েছেন।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের সময় দখলকারীরা বাধা প্রদান করেন। এরপর স্থানীয় কয়েকজনের নেতৃত্বে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল বনকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। অভিযোগ করা হয়েছে যে, হামলাকারীদের অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্র ছিল। বন বিভাগ জানিয়েছে, এই অভিযানের মাধ্যমে তিনটি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে প্রায় পাঁচ একর সরকারি বনভূমি দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আজ কোদালা বিটের অ্যাভিয়ারি অ্যান্ড ইকো-পার্কের গাড়ি রাখার জায়গার পাশে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়। সেখানে সরকারি বনভূমিতে অবৈধভাবে নির্মিত দুটি ঘর ও ঘেরাবেড়া উচ্ছেদ করেন বনকর্মীরা। এরপর তাঁরা পার্কের বনভোজনের জন্য নির্ধারিত জায়গায় নির্মিত স্থাপনা উচ্ছেদে যান। সেখানে একটি ঘর ভেঙে দেওয়ার পর দখলকারীরা বাধা দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সাময়িকভাবে অভিযানটি বন্ধ রাখা হয়।
রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহরাজ উদ্দীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘বেদখল হওয়া বনভূমি উদ্ধার করতে আজ অভিযানে যাই। খবর পেয়ে দুই থেকে আড়াই শ লোক জড়ো হন। তাঁরা কোনো কথা শুনতে রাজি হননি। মারধর শুরু করেছেন। লোকজন এসে কিলঘুষি দেওয়া শুরু করেন। পরে কোনোভাবে প্রাণে বেঁচে এসেছি।’
মেহরাজ উদ্দীনের অভিযোগ, এই হামলায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের কয়েকজনকে তাঁরা চিহ্নিত করেছেন। বর্তমানে মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। তিনি আরও জানান, চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই বনভূমি দখল, পাহাড় কাটা ও গাছ কাটার বিষয়ে মামলা রয়েছে।
তবে এই ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন মত দিয়েছেন রাঙ্গুনিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর হামলার কোনো তথ্য তাঁর কাছে নেই। তিনি যতটুকু শুনেছেন, অ্যাভিয়ারি অ্যান্ড ইকো-পার্ক সম্প্রতি ১৩ জন ব্যক্তি ইজারা নিয়েছেন। ইজারাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, পার্কের আওতাধীন কিছু জায়গায় স্থানীয় লোকজন ঘরবাড়ি নির্মাণ করেছেন। আজ বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ইজারাদারেরা সেখানে গিয়ে কয়েকটি ঘর ভেঙেছেন। এ সময় এক নারীকে মারধরের অভিযোগও রয়েছে। পরে এলাকার লোকজন তাঁদের ধাওয়া দেন এবং সড়কে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন।
ওসি আরও জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ যে, উচ্ছেদের আগে তাঁদের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং অভিযানের বিষয়ে পুলিশকেও অবহিত করা হয়নি। ঘরবাড়ি থেকে লোকজনকে বের করে দেওয়ার সময় এক নারীর মাথায় আঘাত লাগার এবং আরও কয়েকজন আহত হওয়ার খবর তিনি শুনেছেন, তবে এসব বিষয়ে তাঁর কাছে নিশ্চিত তথ্য নেই।
ওসি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা চিকিৎসা নিয়ে থানায় অভিযোগ করতে আসতে পারেন। তবে এখন পর্যন্ত কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেননি এবং কোনো এজাহারও পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
ওসির এই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ সোহেল রানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘অভিযান পরিচালনা করা ভূমিতে নতুন ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সাধারণত নতুন ঘরে অভিযান চালানোর কাজ বন বিভাগের কর্মীরাই করেন। অভিযানে গিয়ে কাউকে মারধর করা হয়নি। কাউকে আঘাত করা হয়নি। উল্টো বন বিভাগের কর্মকর্তাকে আহত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
বারবার হামলার শিকার বনকর্মীরা
রাঙ্গুনিয়ায় বনভূমি উদ্ধার করতে গিয়ে বনকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা নতুন কিছু নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বনভূমি দখলমুক্ত করতে গিয়ে হামলা, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন বন বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এমনকি বনকর্মীদের কার্যালয়ে আটকে রেখে গাছ কেটে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এই উপজেলায় এখনো প্রায় দুই হাজার একর বনভূমি বেদখলে রয়েছে। কোদালা, নারিশ্চা, চিরিঙ্গা, পোমরা ও নিশ্চিন্তপুর বন বিটের বিভিন্ন এলাকায় বনভূমি দখল করে বসতি স্থাপন এবং পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ৭ মার্চ রাতে ৪০ থেকে ৪৫ জন অস্ত্রধারী কোদালা বিটের কর্মকর্তা খোন্দকার মাহাবুবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের কার্যালয়ে আটকে রাখেন বলে থানায় করা একটি সাধারণ ডায়েরিতে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বাইরে থেকে তালা দিয়ে তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া হয়। ওই সময় চন্দ্রঘোনা ইউনিয়নের দক্ষিণ জঙ্গল নিশ্চিন্তপুর এলাকার সেগুনবাগান থেকে ২৪টি সেগুনগাছ কেটে নিয়ে যাওয়া হয়।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, দখলকারীদের প্রতিরোধ করতে গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে বনকর্মীদের প্রায় ৩০টি গুলি ছুড়তে হয়েছে। অন্যদিকে দখলকারীদের পক্ষ থেকেও পাল্টা গুলি চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হুমকি ও হামলার চেষ্টার ঘটনায় রাঙ্গুনিয়া থানায় অন্তত ১০টি সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন বন বিভাগের কর্মকর্তারা। এসব ঘটনায় বনভূমি থেকে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ কিংবা গাছ কাটা বন্ধ করতে গেলে দলবদ্ধভাবে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাঙ্গুনিয়ায় বনভূমি দখল ও পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অনেকের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। ফলে বনভূমি দখলমুক্ত করার পরও একই জায়গায় নতুন করে ঘর নির্মাণের চেষ্টা চলে। অভিযানে গেলে লোকজন জড়ো করে বাধা দেওয়া হয়, যার ফলে অল্পসংখ্যক বনকর্মীর পক্ষে বনভূমি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।