চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড় কাটা, বনভূমি বেদখল এবং বৃক্ষনিধনের হার বাড়ছে। এই অবৈধ কার্যক্রম চালানোর সময় স্থানীয় অপরাধী চক্র বনকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। রাঙ্গুনিয়ার কোদালা, নারিশ্চা, চিরিঙ্গা কিংবা নিশ্চিন্তপুর বিটের বিস্তৃত বনাঞ্চলে অব্যাহত আগ্রাসন আমাদের প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি পরিবেশের ওপর চলা এই নিদারুণ বর্বরতার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে সরকারি দল ও তৎকালীন মন্ত্রী পরিবারের প্রভাব ব্যবহার করে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী বনভূমির শত শত একর জমি দখল ও সম্পদ লুণ্ঠন করেছে। তবে চরম উদ্বেগের বিষয় হলো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং ক্ষমতার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই অশুভ চর্চা থামেনি। কেবল দখলের ‘হাতবদল’ হয়েছে। আওয়ামী লীগের হাত থেকে দখলদারি এখন স্থানীয় অন্য দলগুলোর নেতা-কর্মীদের পরিচয়ে পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধী ও বনদস্যুদের এই পরিচয় বদলের রাজনীতি প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় রাজনৈতিক সদিচ্ছার কতখানি অভাব রয়েছে।

সীমিত জনবল, অপর্যাপ্ত অস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার অভাবে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা দস্যুদের বিরুদ্ধে প্রায় অবরুদ্ধ ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অস্ত্রধারী অপরাধীরা কর্মকর্তা ও কর্মীদের কার্যালয়ে আটকে রাখা, এলোপাতাড়ি কোপানো কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার সাহস পাচ্ছে। কারণ, তারা জানে যে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পারছে না। সামান্য কটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতায় আটকে থেকে এমন সশস্ত্র ও সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রকে দমন করা অবাস্তব।

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা সত্যি হলে আগামী এক দশকের মধ্যে রাঙ্গুনিয়ার প্রাকৃতিক বনাঞ্চল মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। একটি দেশের পরিবেশগত নিরাপত্তার স্বার্থে এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

এই সংকট নিরসনে সরকারের অবিলম্বে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা দরকার। রাজনৈতিক পরিচয় যা–ই হোক না কেন, বন দখলকারী ও পাহাড় কাটায় যুক্ত অপরাধীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করে রাঙ্গুনিয়ার অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে দ্রুততম সময়ে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালানো প্রয়োজন। পাশাপাশি বন রক্ষায় কর্মরত কর্মীদের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। রাজনীতি যদি প্রকৃতিকে গ্রাস করতে থাকে, তবে তার খেসারত দিতে হবে পুরো মানবসমাজকে—এ সত্য সংশ্লিষ্ট সব মহলকে দ্রুত উপলব্ধি করতে হবে।