রাজধানী ঢাকায় চাঁদাবাজির ক্রমবর্ধমান ঘটনার প্রেক্ষিতে সক্রিয় ৫৪৫ জন সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে।

তালিকায় থাকা চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি)। তবে পুলিশ এখন পর্যন্ত পুরোদমে এই অভিযান শুরু করতে পারেনি। কারণ, তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়াগুলো ঠিক কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে কর্মকর্তাদের কাছে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালিকায় থাকা অনেক ব্যক্তির সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে কি না, তা নিয়ে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা দ্বিধায় ভুগছেন।

উল্লেখ্য যে, বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর দ্বিতীয়বারের মতো এই ধরনের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এর আগে ডিএমপি ১ হাজার ২০০ জনেরও বেশি সন্দেহভাজন চাঁদাবাজের একটি তালিকা তৈরি করেছিল, যেখানে দেখা গিয়েছিল যে একটি বড় অংশই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন জানান, আগের তালিকাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই করার পর এবং মাঠপর্যায় থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহের পর সর্বশেষ এই তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, তালিকাভুক্ত কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীতে চাঁদাবাজি ও জমি দখলের বেশ কিছু ঘটনা সামনে এসেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে যখন জনমনে সমালোচনা বাড়ছে, ঠিক তখনই এই তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি সন্দেহভাজন চাঁদাবাজ রয়েছে তেজগাঁও বিভাগে, যাদের সংখ্যা ১৫৫ জন। এরপর গুলশানে ৮৫ জন, উত্তরায় ৭২ জন, লালবাগে ৭১ জন, মিরপুরে ৬৬ জন, রমনায় ৫০ জন, ওয়ারীতে ২৪ জন এবং মতিঝিলে ২২ জন রয়েছেন।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, এই তালিকার মধ্যে ২১৫ জনের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এদের মধ্যে অন্তত ৭৫ জনের সঙ্গে বিএনপি বা এর সহযোগী সংগঠনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত বাকি ১৩৪ জনের কোনো রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক পরিচয় পাওয়া যায়নি। অবশিষ্ট ছয়জনের মধ্যে দুজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দুজন সাবেক পুলিশ সদস্য।

ডিএমপির মিডিয়া উইংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৮ অক্টোবর পর্যন্ত তালিকাভুক্ত ৪১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি মিজানুর রহমান স্বপনও রয়েছেন।

গত ৫ অক্টোবর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) স্বপনকে আটক করে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করে। পরদিন পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেন। এক চিকিৎসকের কাছে চাঁদাবাজির অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল।

এসআরবি সূত্র জানিয়েছে, ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার অভিযোগেই স্বপনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, এসআরবি কোনো নির্দিষ্ট মামলার আসামি হিসেবে স্বপনকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেনি। ফলে একটি পুরোনো চাঁদাবাজির মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

তেজগাঁও বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি এসআরবি খিলক্ষেত এলাকার এক বিএনপি নেতাকে তাদের কাছে হস্তান্তর করেছে, যার নাম ওই তালিকায় ছিল। ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল, কারণ তাকে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা নিয়ে আমরা সিদ্ধান্তহীনতায় ছিলাম। পরে কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজির এক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কিন্তু দুই দিনের মধ্যেই তিনি জামিন পেয়ে যান।”

তিনি আরও বলেন, “তালিকাভুক্ত কোনো চাঁদাবাজ যদি দুই-তিন দিনের মধ্যেই জামিন পেয়ে যান, তবে এভাবে তালিকা করে বা গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা মামলা ছাড়া পুলিশ চাইলেই কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। আমরা যদি কেবল তালিকার ওপর ভিত্তি করে কাউকে গ্রেপ্তার করি, তবে তাকে কোন মামলায় গ্রেপ্তার দেখাব? এ ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন। যেহেতু এখন পর্যন্ত আমরা কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাইনি, তাই আমরা ধীরে এগোচ্ছি।”

পুলিশের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা মনে করেন, শুধু পুলিশের পক্ষে এই অভিযান কার্যকরভাবে চালানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যেকোনো সময় রোষানলে পড়ার ভয় পাচ্ছেন।

তালিকায় থাকা অনেক চাঁদাবাজেরই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে উল্লেখ করে ডিএমপির এক অতিরিক্ত উপকমিশনার বলেন, “মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের যখনই তাদের (চাঁদাবাজদের) গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তারা তা করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তাদের যুক্তি হলো, এই ব্যক্তিরা বিভিন্ন সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদের ঘনিষ্ঠ, তাই পরে তারা এর প্রতিশোধ নিতে পারে।”

তিনি মনে করেন, যদি এসআরবি (র‍্যাব) বা সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়, তবে তা অধিক কার্যকর হবে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রত্যাশা পূরণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বদ্ধপরিকর। যারা এই প্রতিশ্রুতি নষ্ট করতে চায়, সে আমাদের দলের হোক বা বাইরের—প্রশাসনের উচিত তাদের কাউকে ছাড় না দেওয়া। অপরাধে জড়িত ব্যক্তি যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে দল বা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বাধা নেই।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের নেতা তারেক রহমান যেখানে অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই একজন ক্ষমতাসীন সংসদ সদস্যকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছেন, এমনকি ছাত্রদল ও যুবদলসহ দলের মহানগর ইউনিটের কমিটি বিলুপ্ত করেছেন, সেই উদাহরণের পর কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য আর কোনো বার্তা বাকি থাকে?”

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ জানান, যৌথ অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধীদের কোনো ঢাল হতে পারে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তিনি জানান, আইন অনুযায়ীই পুলিশ ব্যবস্থা নেবে।