ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস থেকে ফেরার পথে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মানকে গত মঙ্গলবার দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তিন ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত তাঁকে যেতে দেওয়া হলেও, বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে ৫০ হাজার রুপি জরিমানা করতে হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর দল আম আদমি পার্টি (আপ)। দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে হেনস্তা করেছে। কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই তাঁকে তিন ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। দলের দাবি, দেশের কোনো মুখ্যমন্ত্রীকে দেশেরই কোনো বিমানবন্দরে আগে এভাবে হেনস্তা হতে হয়নি।

আপের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিংয়ের বিদেশ সফর আটকাতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছিল, তাই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর আগে চারবার তাঁকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। এবারও কেন্দ্র অনুমতি দিতে চায়নি, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী আদালতের শরণাপন্ন হন এবং আদালতের নির্দেশ পেয়েই ফ্রান্স সফরে যান। কেন্দ্র তাঁকে আটকাতে ব্যর্থ হয়েই এভাবে হেনস্তা করেছে বলে আপ মনে করে।

মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং প্যারিসে গিয়েছিলেন একটি আন্তর্জাতিক খাদ্যবাণিজ্য প্রদর্শনীতে অংশ নিতে। ‘এসআইএএল প্যারিস ২০২৬’ নামের ওই প্রদর্শনীতে তিনি অংশ নেন পাঞ্জাব রাজ্যে উৎপাদিত এক বিশেষ ধরনের ছোলা ও রাজমার প্রসার ও প্রচারের উদ্দেশ্যে।

মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্তের ‘হেনস্তার’ খবর জানিয়ে পাঞ্জাব আম আদমি পার্টির মিডিয়া ইনচার্জ বলতেজ সিং পান্নু একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, “মুখ্যমন্ত্রীকে ইচ্ছাকৃতভাবে তিন ঘণ্টা দিল্লি বিমানবন্দরে আটকে রাখা হয়েছে। আদালতের নির্দেশে তিনি প্যারিস গিয়েছিলেন বলেই এই হয়রানি। শুধু তা–ই নয়, তাঁকে ৫০ হাজার রুপি জরিমানাও করা হয়েছে।”

পান্নুর অভিযোগ, পাঞ্জাবিদের অপমান ও অসম্মান করার কোনো সুযোগই কেন্দ্রীয় সরকার ছাড়ে না। তিনি ওই ভিডিও বার্তায় আরও জানান, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের নির্দেশে ভগবন্ত সিং প্যারিস গিয়েছিলেন। কেন্দ্র তাঁকে ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ দিতে না চাওয়ায় তিনি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হয়েছিলেন। হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীকে উপযুক্ত প্রটোকল অনুযায়ী সম্মান দিতে হবে। তা সত্ত্বেও প্যারিসের কনসাল জেনারেল তাঁর সঙ্গে দেখা করেননি।

পান্নুর দাবি অনুযায়ী, মালপত্রের অজুহাত দেখিয়ে ভগবন্তকে দিল্লি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করানো হয়। প্রথমে বলা হয় যে তাঁর মালপত্র আসতে দেরি হচ্ছে, এরপর বলা হয় সেগুলো পরীক্ষা করা হচ্ছে। তিন ঘণ্টা পর যখন তাঁকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়, তখন ৫০ হাজার রুপি জরিমানা করা হয়।

কেন এই জরিমানা, সে বিষয়ে ভগবন্তকে বলা হয় যে, মুখ্যমন্ত্রী নাকি কিছু মালপত্রের সঙ্গে থাকা কিছু জিনিস ঘোষণা করেননি। এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অর্থও নাকি তাঁদের সঙ্গে ছিল। পান্নু জানান, সরকারি কর্তারা স্বীকার করেছেন যে তাঁদের ওপর ওপরমহলের প্রবল চাপ ছিল।

দিল্লির আপ নেতা সৌরভ ভরদ্বাজও এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’ হ্যান্ডলে একটি পোস্ট করেন। গতকাল রাতের সেই পোস্টে তিনি লিখেছেন, “কেন্দ্রের এই ঔদ্ধত্য এবার শেষ হওয়া দরকার। রাবণের ঔদ্ধত্যও দসেরার দিন শেষ হয়েছিল।”

আম আদমি পার্টি কেন্দ্রীয় সরকারের তীব্র সমালোচনা করলেও পাঞ্জাবের শিরোমনি অকালি দলের নেতা বিক্রম সিং মাজিথা ‘এক্স’ হ্যান্ডলে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, আইন ভাঙার জন্যই মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত ও তাঁর স্ত্রী গুরপ্রীত সিং কৌরকে আটকে রাখা হয়েছিল।

সূত্রের বরাত দিয়ে ওই বার্তায় মাজিথা লিখেছেন, মুখ্যমন্ত্রী ও তাঁর সঙ্গীদের কাছে নিয়মের চেয়েও বেশি মালপত্র ছিল। অর্থও ছিল অনুমতির চেয়ে বেশি। কেন এত মালপত্র ও অর্থ, তার সদুত্তর তাঁরা দিতে পারেননি। সে কারণেই দেরি ও জরিমানা। মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষা করতেই তাঁদের চলে যেতে দেওয়া হয়েছে।

উল্লেখ্য, শিরোমনি অকালি দল ছিল বিজেপির প্রথম জোটসঙ্গী। তবে বিতর্কিত কৃষি আইনকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সালে দুই দলের বিচ্ছেদ ঘটে। ২০২৭ সালের গোড়ার দিকে পাঞ্জাব বিধানসভার নির্বাচন উপলক্ষে বিজেপি ও অকালি দল পুনরায় কাছাকাছি আসতে চলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিক্রম সিং মাজিথার পোস্টটি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। এই জোট বাস্তবায়িত হলে পাঞ্জাবের ভোট আরও একবার ত্রিমুখী লড়াইয়ে পরিণত হবে, যেখানে লড়াই হবে আপ বনাম কংগ্রেস বনাম বিজেপি-অকালি জোটের মধ্যে।

মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত যখন দিল্লি বিমানবন্দরে ‘হেনস্তার’ মুখে, ঠিক সেই সময়েই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পাঞ্জাব সফরে ছিলেন। শাহ ঘোষণা করেছেন, ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে গোটা পাঞ্জাবকে মাদকমুক্ত রাজ্য করে তুলবেন।

আপ সরকারের সমালোচনা করে অমিত শাহ বলেন, এই দল ও তাদের সরকার মাদকের কারবার বন্ধ তো করেইনি, বরং গোটা রাজ্যকেই মাদকাসক্ত করে তুলেছে। মাদকমুক্ত পাঞ্জাব গড়ে তোলা তাঁর অঙ্গীকার।