একটি মুসলিম পরিবারে নতুন শিশুর আগমনে চারদিকে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়। জন্মের আগেই শিশুটির জন্য যাবতীয় জাগতিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। তবে উৎসবের এই রঙিন আমেজে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের নামাজ কাজা হয়ে যায় এবং সুন্নত অনুযায়ী আকিকা বা তাহনিকের মতো গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো উপেক্ষিত থেকে যায়।

সন্তানের বয়স যখন দশ বছর পার করে, তখন মা-বাবারা হঠাৎ করে তাকে নামাজ পড়ার তাগিদ দিতে শুরু করেন। অথচ দেখা যায়, অভিভাবকরা নিজেরা নিয়মিত নামাজ পড়েন না কিংবা অজুর সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কেও অবগত নন। তাড়াহুড়ো করে সন্তানকে কোরআন পাঠ শেখানো হলেও, কোরআনের ভেতরে কী বার্তা রয়েছে তা সে জানতে পারে না।

কিশোর বয়সে জীবন ও জগতের সৃষ্টি নিয়ে যখন তার মনে কৌতূহলী প্রশ্ন জাগে, তখন সেগুলোকে প্রজ্ঞার সাথে উত্তর না দিয়ে বরং ধমক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে ক্লাসের পড়াশোনা এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের প্রতিযোগিতাকেই জীবনের একমাত্র অগ্রাধিকার হিসেবে সামনে রাখা হয়।

বিশ বছর পর সেই সন্তান যখন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পা রাখে এবং পরিবার থেকে দূরে মুক্ত পরিবেশে বাস করতে শুরু করে, তখন সে এক সম্পূর্ণ নতুন সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়। চারপাশে যখন অবাধ মেলামেশা, পার্টি, মদ ও ভোগবাদী জীবনযাত্রাকে স্বাভাবিক ও আধুনিক বলে গণ্য করা হয়, তখন ইমানের দুর্বল ভিত্তি নিয়ে বড় হওয়া তরুণটির জন্য হালাল-হারাম মেনে চলা কিংবা নামাজ আদায় করা এক বিরাট মানসিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

সহপাঠীদের দলে ভিড়ে যাওয়া এবং তথাকথিত ‘জনপ্রিয়’ হওয়ার তাড়নায় সে নিজের ধর্মীয় পরিচয় ও নিয়মগুলোকে অগ্রগতির বাধা মনে করতে শুরু করে। সঠিক ধর্মীয় জ্ঞান না থাকায় ত্যাগের চেয়ে ভোগবিলাসের প্রলোভন তার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে এবং সে তথাকথিত ‘মুক্ত’ জীবনের আশায় ধর্ম থেকে দূরে সরে যেতে চায়।

বিশ্বজুড়ে মুসলিম সমাজের তরুণদের মাঝে এটি আজ এক ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, বিশ্বায়নের প্রভাব এবং সংস্কৃতির অবাধ মিশ্রণের এই যুগে তরুণ প্রজন্ম কেন ধর্মের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে—তার কয়েকটি মৌলিক কারণ বিশ্বস্ত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে তরুণদের ধর্মবিমুখতার শুরু হয় শৈশবের পারিবারিক উদাসীনতা থেকে। জীবনের প্রথম দশ বছরে শিশুর অন্তরে বিশ্বাসের মূল শিকড় গভীরভাবে রোপণ করা প্রয়োজন। ইসলামি আকিদার মৌলিক স্তম্ভগুলো—এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, ফেরেশতা, আসমানি কিতাব, রাসুলগণ, পরকাল এবং তকদিরের ওপর বিশ্বাস—শুধু আক্ষরিক মুখস্থের বিষয় নয়, বরং তা জীবনদর্শনের সঙ্গে যুক্ত করার দায়িত্ব অভিভাবকের।

পবিত্র কোরআনে মা-বাবা ও সমাজকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, “হে ইমানদারগণ, তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো জাহান্নামের আগুন থেকে।” (সুরা তাহরিম, আয়াত: ৬)

কিন্তু শৈশবে যদি ধর্মকে শুধু কিছু যান্ত্রিক প্রথা হিসেবে শেখানো হয় এবং জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলোর প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর না দেওয়া হয়, তবে শিশুটি ইমানদার মুমিনের বদলে শুধু একজন ‘সাংস্কৃতিক মুসলিম’ হিসেবে বড় হয়ে ওঠে। প্রথাগত এই চর্চা তাকে সাময়িক পরিচয় দিলেও অন্তরে কোনো গভীর বিশ্বাস তৈরি করতে পারে না।

সন্তানকে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলার মধ্যে কোনো ভুল নেই। কিন্তু যখন এই জাগতিক শিক্ষা সন্তানের নৈতিকতা, ইমানি চেতনা ও চরিত্র গঠনের বিনিময়ে আসে, তখনই তৈরি হয় বিপত্তি। বর্তমান শিক্ষিত সমাজে সন্তানদের লেখাপড়ার জাঁতাকলে এমনভাবে আটকে ফেলা হয় যে, সেখানে আত্মিক বিকাশ বা ধর্মীয় শিক্ষার স্থান হয়ে পড়ে গৌণ। সন্তানকে গণিত, বিজ্ঞান কিংবা ইংরেজি শেখাতে মা-বাবা যতটা সময় ও অর্থ ব্যয় করেন, কোরআনের গভীর অর্থ ও জীবনবোধ শেখাতে তার সামান্য অংশও ব্যয় করেন না। ফলে শিশুটি শুধু বস্তুবাদী মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠে, যেখানে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া ও অর্থসম্পদ অর্জন করাই হয়ে দাঁড়ায় জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

আধুনিক পৃথিবীর বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা, চিকিৎসা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অমুসলিম দেশগুলোর ব্যাপক অগ্রগতি তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বিশ্বমঞ্চে মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনুন্নয়ন তাদের মনে ক্ষোভের জন্ম দেয়। তরুণদের মনে প্রশ্ন জাগে—“আমাদের ধর্ম যদি সত্য হয়, তবে বিশ্বজুড়ে মুসলিমরা বৈষয়িক অগ্রগতি ও সম্মানের বিচারে কেন এত পিছিয়ে?”

বাস্তব জীবনে সফল ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিত্বদের অধিকাংশই অমুসলিম হওয়ায় তরুণেরা ধরে নেয় যে, ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে হয়তো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে সফল হওয়া সম্ভব নয়। ফলে ধনসম্পদ ও জাগতিক ক্ষমতার মোহে তারা ধর্মীয় অনুশাসন ত্যাগ করাকেই সফলতার সহজ পথ বলে মনে করে।

শিক্ষাক্ষেত্রে বয়সে তরুণেরা খুব দ্রুত চারপাশের পরিবেশ থেকে প্রভাব গ্রহণ করে। সেখানে সহপাঠীদের সমর্থন ও বন্ধুদের স্বীকৃতি পাওয়া তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রেও বন্ধুদের এই নেটওয়ার্ক প্রভাব ফেলে। চারপাশের বন্ধুরা যখন ধর্মীয় অনুশাসন উপেক্ষা করে শুধু পার্থিব আনন্দ ও চাকরির পেছনে ছুটতে থাকে, তখন ইমানি শক্তিতে দুর্বল তরুণটি মানসিকভাবে একা হয়ে পড়ে। সহপাঠীদের মাঝে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য সে ধীরে ধীরে ধর্মীয় অভ্যাসগুলো ত্যাগ করতে শুরু করে। ধর্ম যখন তার বন্ধুভাবাপন্ন সম্পর্ক বা সামাজিক জীবনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সে ধর্মীয় আত্মপরিচয়কেই আড়াল করা সহজ মনে করে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, তরুণ সমাজ ধর্ম থেকে দূরে সরে যাওয়ার মূল কারণ হলো—ইমানের দুর্বলতা এবং আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার জীবনকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া। মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমরা প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৯৩)

আমরা অভিভাবক ও সমাজ হিসেবে যদি সন্তানদের আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার সফলতাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে শিক্ষা দিই, তবে দিনশেষে তাদের ধর্মহীনতায় অবাক হওয়া অনুচিত। তরুণদের সমাজ ও ধর্মের প্রতি এই যে অনীহা বা বিরক্তি, তা মূলত আমাদের নিজেদের তৈরি করা ভুল অগ্রাধিকারেরই ফসল।

তরুণ সমাজকে এই আত্মিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে হলে অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারকদের নিজেদের চিন্তা ও মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। শৈশব থেকেই সন্তানদের কোরআনের শাশ্বত বার্তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, তাদের কৌতূহলী প্রশ্নের প্রজ্ঞাপূর্ণ জবাব দিতে হবে এবং সাফল্য মানে শুধু বৈষয়িক উন্নতি নয়, বরং এক পবিত্র চরিত্র ও ইমানি জীবন—এই বিশ্বাস তাদের অন্তরে রোপণ করতে হবে। তবেই আমাদের নতুন প্রজন্ম বিশ্বায়নের ঝড়ের মুখেও নিজেদের ধর্মীয় ও ইমানি পরিচয় নিয়ে সগর্বে টিকে থাকতে পারবে।