পদ্মা নদীর বুকে পানির প্রাচুর্য থাকলেও মাঝনদীতে জেগে উঠেছে ছোট-বড় অসংখ্য ডুবচর। কোথাও নদীর বুকজুড়ে পলি জমে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নৌপথ, আবার কোথাও তীব্র স্রোতের প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে চলতে হচ্ছে ফেরিগুলোকে।

ডুবচর এড়িয়ে দীর্ঘ পথ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে ফেরিগুলোকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঘাটের তীব্র সংকট। সব মিলিয়ে দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে পারাপার এখন দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ এবং চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি সময় লাগছে পারাপারে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রী ও চালকেরা, পাশাপাশি বাড়ছে জ্বালানি খরচও।

সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশির মাঝেই ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য ডুবচর। নদীর প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এসব চর জেগে ওঠায় ফেরিগুলোর স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তীব্র স্রোতের বিপরীতে নিরাপদ পথ খুঁজে নিতে ফেরিগুলোকে প্রায় ১০ কিলোমিটার ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে। একই ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে আরিচা-কাজিরহাট নৌপথেও। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রী ও পরিবহনচালকেরা।

নদীপথের এই সংকটের পাশাপাশি দুই পাড়ের ঘাট ব্যবস্থাপনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কাগজে-কলমে দুই পাড়ে ১২টি ঘাট থাকলেও বর্তমানে চালু রয়েছে মাত্র পাঁচটি। বাকি সাতটি ঘাট বন্ধ। ফলে সীমিতসংখ্যক ঘাট দিয়ে ফেরি পরিচালনা করতে গিয়ে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হচ্ছে। ঘাটে পৌঁছানোর পরও যানবাহন ও যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় নদীতে অবস্থান এবং বাড়তি পথ ঘুরে চলাচলের কারণে ফেরির জ্বালানি খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।

মিলন আহম্মেদ নামে এক যাত্রী বলেন, এখন এই পথে যাওয়া-আসা করতে আগের চেয়ে অনেক সময় লাগে। স্রোতের কারণে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে।

সাবিনা ইয়াসমিন নামের আরেক যাত্রী বলেন, ‘নদীতে স্রোত থাকায় ফেরিগুলোকে অনেকটা পথ ঘুরে ধীরে চলাচল করতে হয়। এতে পারাপারে অনেক সময় লেগে যায়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ও নদীপথে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ায় যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।’

যাত্রী ও চালকদের অভিযোগ, প্রতিবছর নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিং করা হলেও সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। তাদের দাবি, অপরিকল্পিতভাবে খনন এবং উত্তোলিত পলি নদীর ভেতরেই ফেলার কারণে আবারও নৌ-চ্যানেলে পলি জমছে। এতে খনন করা অংশ দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ডুবচর। ফলে ড্রেজিংয়ের পরও খুব অল্প সময়ের মধ্যে আগের পরিস্থিতি ফিরে আসছে।

গাড়িচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোনোভাবে সফল হচ্ছে না। আবার বালু পড়ে, আবার আগের মতো হয়ে যায়। নদীর মাটি নদীতে ফেললে আবার পানিতে চলে যাচ্ছে। প্রতিবছর টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।’

আরেক বাসচালক মিলন হোসেন বলেন, নাব্যতা সংকট দূর করার পাশাপাশি বন্ধ ঘাটগুলো চালু করে ফেরি পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তা না হলে প্রতিবছর ড্রেজিংয়ে অর্থ ব্যয় হলেও ডুবচর, তীব্র স্রোত ও ঘাট সংকটের কারণে ভোগান্তি থেকেই যাবে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে স্বাভাবিক ফেরি চলাচল নিশ্চিত করার দাবি তার।

এদিকে নাব্যতা সংকট ও ডুবচরের কারণে ফেরি চলাচল ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা অঞ্চলের ডিজিএম আব্দুস সালাম। তিনি জানান, বেশ কিছুদিন ধরেই এই সমস্যার কারণে ফেরি চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

আব্দুস সালাম বলেন, দৌলতদিয়ার প্রধান ঘাট হিসেবে পরিচিত ৭ নম্বর ঘাটে বর্তমানে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ৩, ৪ ও ৬ নম্বর ঘাট দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ৩ ও ৪ নম্বর ঘাটের দিকে পানির স্রোত বেশি থাকায় ফেরি পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। ৭ নম্বর ঘাট আবার চালু করা সম্ভব হলে ফেরি চলাচল অনেক সহজ হবে এবং ঝুঁকি কমবে বলে জানান তিনি।

পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। এ পথে ফেরি চলাচল ব্যাহত হলে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি পণ্য ও যানবাহন পরিবহনেও বাড়তি সময় লাগে। তাই শুধু নিয়মিত ড্রেজিং নয়, নদীর গতিপ্রবাহ ও পলি জমার ধরন বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে খনন, উত্তোলিত পলি নদীর বাইরে নিরাপদ স্থানে অপসারণ এবং নিয়মিত তদারকি জরুরি বলে মনে করছেন যাত্রী ও চালকেরা।