অঞ্জলি, আরতি এবং যথাযথ পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে আজ বুধবার বিজয়া দশমীতে সমাপ্ত হচ্ছে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। দিনের শুরু হবে সকালের দশমী বিহিত পূজা ও দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে। এরপর দেবীকে সিঁদুর দিয়ে বরণ, ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচার পালনের পর বিকেলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এই ছয় দিনের উৎসব। উল্লেখ্য, গত শুক্রবার দেবীর পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “সকাল নয়টায় দশমী বিহিত পূজা শেষে দর্পণ বিসর্জন হবে।” তিনি আরও জানান, সকাল সাড়ে নয়টা থেকে বেলা ১১টার মধ্যে দেবী দুর্গাকে সিঁদুর দিয়ে বরণ করা হবে। এরপর বেলা দেড়টা থেকে দুইটা পর্যন্ত চলবে সিঁদুর খেলা। একই সময়ে রক্তদান কর্মসূচিও পালিত হবে স্বেচ্ছায়।
শুভাশীষ কুমার বলেন, দুপুরের পর থেকে প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি শুরু হবে। বেলা তিনটায় ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির থেকে বিজয়া শোভাযাত্রার সূচনা হবে। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন মণ্ডপ থেকে প্রতিমাগুলো ঢাকেশ্বরী মন্দিরে নিয়ে আসা হবে। পরবর্তীতে ঢাকার ১১টি নির্ধারিত ঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এ বছর ঢাকার মোট ২৫৮টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শান্তি ও মঙ্গলের কামনায় ভক্তরা মহানবমীর পূজা ও অঞ্জলি দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের প্রাঙ্গণ পূজারিদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে। মন্ত্রপাঠ, উলুধ্বনি এবং ঢাক ও কাঁসর ঘণ্টার শব্দের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। পূজা শেষ করে অনেক ভক্ত মন্দির প্রাঙ্গণে বসে থাকা মেলা ঘুরে কেনাকাটা করেন।
সকাল সোয়া ১০টার দিকে মহানবমীর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজা শুরু হয়। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের সাথে সাথে ভক্তরা উলুধ্বনি দেন। কেউ দুই হাত জোড় করে প্রণাম জানান, আবার কেউ দেবী দুর্গার জয়ধ্বনি দেন। বেলা ১১টার দিকে ভক্তদের হাতে অঞ্জলির ফুল ও বেলপাতা দেওয়া হয় এবং সোয়া ১১টার দিকে অঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে পূজার এই পর্বটি শেষ হয়।
সরকারি কর্মকর্তা অজিত দেব তাঁর স্ত্রী খুমপুই ত্রিপুরা এবং দুই ছেলে অভিরাজ ও অভিরূপকে নিয়ে পূজা দিতে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন গৃহসহায়ক উরিনা ত্রিপুরা। ধানমন্ডিতে বসবাসকারী অজিত দেব বলেন, “পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করতে পেরে ভালো লাগছে। সন্তানদের নিয়ে পূজায় আসা শুধু ধর্মীয় আচার পালনের বিষয় নয়, তাদের কাছে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরারও একটি সুযোগ। মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, সবার জীবনে শান্তি, সুস্থতা ও মঙ্গল আসুক। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই যেন মিলেমিশে ভালো থাকতে পারি।”
মন্দির প্রাঙ্গণে পূজার পাশাপাশি একটি মেলা বসেছে। সেখানে বিভিন্ন স্টলে গৃহস্থালির বাসনকোসন, চুড়ি, গয়না, কাপড়চোপড় ও শিশুদের খেলনা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পূজা দিতে আসা অনেক মানুষ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলা ঘুরে দেখছেন এবং পছন্দের জিনিস কিনছেন।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উপদেষ্টা অরূপরতন চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “মহালয়া থেকে ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী হয়ে মহানবমী পর্যন্ত দুর্গোৎসবের প্রতিটি পর্ব এবার ভালোভাবে উদ্যাপন করা গেছে।” এই সুন্দর পরিবেশের জন্য তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
অরূপরতন চৌধুরী বলেন, মা দুর্গা দুর্গতি নাশ ও অসুর বিনাশের প্রতীক। দেবীর কাছে তাঁরা মানুষের অশুভ প্রবৃত্তি ও অশান্তি দূর হওয়ার প্রার্থনা করেন। দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকুক, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটুক এবং সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করুক—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা। অন্যায়-অবিচার থেকে দূরে থেকে সবাই যেন সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারেন, মহানবমীতে দেবীর কাছে সেই মঙ্গলও কামনা করেন ভক্তরা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত ধর্মদাস চক্রবর্তী বলেন, “মা আমাদের সবার অভিপ্রায় স্বর্গে নিয়ে গেছেন। আমাদের ইচ্ছাগুলো সব দেবতার কাছে ভাগ করে দেবেন। যার যা প্রয়োজন, তাকে তা–ই দেবেন। তবে এত এত আনন্দের মধ্যেও মাকে বিদায় দিতে হবে। এ বিদায়-বিসর্জন দুঃখের।”