দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এবং কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, এই ষড়যন্ত্রের বিষয়ে তাঁর কাছে সুস্পষ্ট গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, পলাতক স্বৈরাচারী শক্তি শ্রমিকদের মধ্যে অশান্তি তৈরির জন্য অর্থ সরবরাহ করছে। এছাড়া নির্বাচনের আগে বিভিন্নভাবে টিকিট বিক্রির চেষ্টা করা কিছু রাজনৈতিক দলও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজশাহীর মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গিয়েছে, তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে।..কাদের সাহায্যে করছে? এই যে কতটা দল আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশের মধ্যে। তারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রি করার চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে। এই দুই পক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরি করার চেষ্টা করছে।”
তারেক রহমান আরও বলেন, বিএনপি সরকার বর্তমানে দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে এবং কৃষকদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। সরকার শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে। তবে কিছু দল রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সরকারের এসব উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে বলে তিনি জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অতীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে যখন দেশের উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তখনও নানা ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তিনি অভিযোগ করেন, এখনো দেশের অগ্রগতির পথ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।
বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাইকে ধারণ করে
বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনসভায় উল্লেখ করেন, বিএনপি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় স্বৈরাচার বিদায় নেওয়ার আগে শত শত ছাত্র ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। সেইসব শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে ধারণ করার কথা বলে যেসব রাজনৈতিক দলকে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তাদের মধ্যে কয়েকটি দলের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “৭১ সালে তারা যেভাবে জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে, ঠিক একইভাবে আমরা দেখেছি, চব্বিশের জুলাই আন্দোলনকেও তারা ধোঁকা দিয়েছে। তারা মুখে একটি কথা বলছে, তাদের কর্মে আরেকটির প্রতিফলন আমরা দেখতে পাচ্ছি।”
এ সময় রাজশাহী অঞ্চলের পদ্মা নদীর পানি কমে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পানির সংকট দূর করতে বিএনপি সরকার পদ্মা ও তিস্তা নদীতে ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশের মানুষের পানির অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মঞ্চে উঠে রাজশাহী অঞ্চলের ৩৮ হাজার ৯৭০ জন আখচাষিকে মুঠোফোনে আর্থিক পরিষেবার মাধ্যমে একযোগে ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা প্রদান করেন।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সভাপতিত্বে এবং রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশন প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমানের সঞ্চালনায় এই জনসভায় বক্তব্য রাখেন ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
‘অতীতের রাজনীতি পরিবর্তন করতে চাই’
এর আগে দুপুর ১২টার দিকে রংপুর নগরের ধর্মসভা রাধাগোবিন্দ মন্দির পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি বলেন, “অতীতে আমরা যে রাজনীতি দেখেছি, তার পরিবর্তন করতে চাই। এই পরিবর্তনের বড় শক্তি হচ্ছে জনগণ। অতীতের মতো জনগণকে পাশে নিয়েই বর্তমান সরকার এগিয়ে যেতে চায়।”
জনগণ দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা চায় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দুঃখের সঙ্গে বলতে চাই, কিছুদিন ধরে আমরা দেখছি, বর্তমান সরকার যে ঐক্য গড়ে তুলতে চাচ্ছে, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চাচ্ছে, একটি মহল তা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে।”
তারেক রহমান বলেন, “এ দেশের মানুষ বর্তমান সরকারকে নির্বাচিত করেছেন। কোনো অঞ্চলে আমাদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, কোনো অঞ্চলে হননি। কিন্তু বর্তমান সরকার এমন একটি সরকার হতে চায়, যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁদেরও সরকার; যাঁরা ভোট দেননি, তাঁদেরও সরকার। বর্তমান সরকার সব মানুষের জন্য কাজ করতে চায়।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, রংপুর মহানগরের উন্নয়নের জন্য দুই সপ্তাহ আগে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে জেলা পরিষদকে কাজে লাগিয়ে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রাম, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।
মন্দিরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেন মন্দির কর্তৃপক্ষ। সেখানে তিনি শিশুদের সঙ্গে সেলফি তোলেন এবং পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখেন। মন্দিরের উন্নয়নের জন্য তিনি ১০ লাখ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। এছাড়া দূর-দূরান্ত থেকে আসা পূজারিদের থাকার জন্য মন্দিরের পেছনে নির্মাণাধীন অবকাঠামোর কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
মন্দির পরিদর্শন শেষে তিনি রাজশাহীর উদ্দেশ্যে রওনা হন। বেলা তিনটার দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী সামরিক উড়োজাহাজটি রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরে অবতরণ করে। আধা ঘণ্টা পর তিনি মাদ্রাসা মাঠে জনসভাস্থলে পৌঁছান। জনসভা শেষে তিনি পুনরায় উড়োজাহাজে করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হন।